প্রায় তিন দশক ধরে আয়কর নিয়ে সামাজিক আন্দোলন, প্রকাশনা, ডিজিটাল পোর্টাল এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে একটি সত্য বারবার সামনে এসেছে-বাংলাদেশে কর সংস্কারের সবচেয়ে বড় শত্রু নীতির অভাব নয়, বাস্তবায়নের দুর্বলতা। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত সারা বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের উদ্যোগটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রস্তাবে চারটি সময়কালে চারটি ভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করছাড় মিলবে। অক্টোবর-ডিসেম্বর হবে নিরপেক্ষ সময়-কোনো ছাড় নেই, কোনো জরিমানাও নেই। জানুয়ারি-মার্চে দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা-যেটি বেশি-অতিরিক্ত দিতে হবে। আর এপ্রিল-জুনে দাখিল করলে সেটি বেড়ে দাঁড়াবে ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। নভেম্বরের একটি মাসে করদাতা, কর পরামর্শক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-তিন পক্ষই যে অসহনীয় চাপে পড়ে, রিটার্ন দাখিল সারা বছরে ছড়িয়ে দিলে সেই জমাটবদ্ধ সংকট অনেকটাই কমবে। রাজস্ব প্রবাহও হবে আরও সুষম ও পূর্বানুমানযোগ্য। কিন্তু মাঠের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ কর দিতে ভয় পান না-কর ব্যবসার জটিলতা ও অস্পষ্টতাকে ভয় পান। নতুন বিধান এসেছে, কিন্তু সময়মতো পরিপত্র আসেনি; সফটওয়্যার হালনাগাদ হয়নি; কর কর্মকর্তারা নিজেরাই নতুন নিয়ম সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না-এমন চিত্র আমরা অতীতেও বহুবার দেখেছি। এবারও প্রশ্নগুলো একই। জুলাই থেকেই করছাড় কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন রিটার্ন পোর্টাল কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করছাড় ও অতিরিক্ত করের হিসাব করতে প্রস্তুত? মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তারা কি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন? করদাতারা কি আগেভাগে জানতে পারবেন কোন সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে তারা কতটুকু সুবিধা পাবেন কিংবা কতটুকু অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থবিল পাস হওয়ার পর সাধারণত এনবিআরকে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, পরিপত্র, নির্দেশিকা এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে হয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে করদাতা ও কর প্রশাসন উভয়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। পরিপত্র ও নির্দেশিকা সময়মতো জারি না হলে, বিশেষ করে যারা কর পরামর্শকের সহায়তায় রিটার্ন দাখিল করেন, তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতে পারেন। এতে একটি ভালো উদ্যোগও বিভ্রান্তি ও অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই স্পষ্টভাবে বলা দরকার-জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই যদি সফটওয়্যার, অনলাইন পোর্টাল, নির্দেশিকা, পরিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে এ উদ্যোগ কর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।  অন্যথায় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির পর আগামী করবর্ষ থেকে এটি কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কর সংস্কারের সফলতা শুধু আইন প্রণয়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং করদাতার আস্থার ওপর। বাংলাদেশের মানুষ কর দিতে প্রস্তুত-যদি ব্যবস্থাটি হয় স্বচ্ছ, সহজ, স্থিতিশীল এবং করদাতাবান্ধব।  সারা বছর রিটার্ন দাখিলের প্রস্তাব সেই সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে সুযোগকে সফলতায় রূপ দিতে হলে একটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে হবে-জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কি এবার সত্যিই প্রস্তুত?

লেখক : সমাজ, রাজস্ব ও পরিবেশ বিশ্লেষক; নির্বাহী পরিচালক, গোল্ডেন বাংলাদেশ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews