আর্জেন্টিনা দলের জয়ের উচ্ছ্বাস আর ট্রফি জয়ের গল্পগুলোতে তিনি ছিলেন আড়ালের নিঃশব্দ কারিগরদের একজন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আলবিসেলেস্তেদের বিশ্বজয়ের নায়কদের একজন নিকোলাস তালিয়াফিকো। কিন্তু জীবনের গতিময় নিয়মেই সময় বদলে যায়। বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে পরাজয়ের তিক্ততা এবং বিদায়ের সুর।
সম্প্রতি নিজের অফিশিয়াল টুইচ চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারে এসে ২০২৬ বিশ্বকাপসহ টানা দুই ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ৩৩ বছর বয়সি তাগলিয়াফিকো। আবেগঘন সেই আলাপে এই ডিফেন্ডার স্পষ্ট করে দিয়েছেন—আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে তার অধ্যায় প্রায় শেষের পথে।
টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো এবং প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তালিয়াফিকো বলেন, ‘আমাদের কাছে ইতোমধ্যেই গোল্ড মডেল (স্বর্ণপদক) রয়েছে। এখন আমাদের কাছে সিলভার (রৌপ্য) মডেলটিও এলো। এটি নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। আমরা যে বিশ্বকাপটি খেলেছি, তা নিয়ে গর্ব করা উচিত। টানা দুটি ফাইনালে পৌঁছানো সহজ কথা নয়, দুটি পদক পাওয়াও সহজ নয়। এটাকে গুরুত্ব দেওয়া শিখতে হবে। কীভাবে হারতে হয়, সেটাও জানতে হবে। এটি প্রমাণ করে যে আপনি শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছেন, নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত ফুটবলে কখনো জয় আসে, আবার কখনো পরাজয়।’
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি এবং পেছনের অক্লান্ত পরিশ্রম কেবল এক বা দেড় মাসের খেলা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে নোটবুক বা ঝুলিতে আরও একটি অর্জন যুক্ত হলো। আর এর মূল্য অনেক, সত্যিই অনেক বেশি। যে পরিমাণ পরিশ্রম করা হয়েছে, তার জন্য এটি মূল্যবান। এটা ভাববেন না যে এই কাজটা মাত্র এক মাসে হয়েছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে আপনি শুধু বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবলেন—যা এক মাস বা তার কিছু বেশি সময় ধরে চলে, এবার তো তাও একটু দীর্ঘ ছিল। এর পেছনে সাড়ে তিন বছরের পরিশ্রম লুকিয়ে আছে।’
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন মারা গেলেন মেসির বাবা হোর্হে মেসি

বিশ্বকাপের জন্য কীভাবে বছরের পর বছর নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, তার ব্যাখ্যায় আলবিসেলেস্তে ডিফেন্ডার বলেন, ‘আগের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই একজন ফুটবলার ভাবতে শুরু করে, ঠিক আছে, খেলাধুলার দিক থেকে আমি কোথায় পৌঁছাতে চাই? শারীরিকভাবে আমি কীভাবে পৌঁছাতে চাই? এটা কেবল এক মাসের বা মে মাসের বিষয় নয়, যা বিশ্বকাপের ঠিক এক মাস আগে শুরু হয়। এটি শুরু হয় তার অনেক আগেই। তখন থেকে লিগে নিজের শারীরিক সক্ষমতা কীভাবে কাজে আসছে বা আসছে না, তা নিয়ে নজর দিতে হয়।’
আর্জেন্টিনার হয়ে ৮৩টি ম্যাচ খেলা এই লেফট-ব্যাক নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত সততার সঙ্গে কথা বলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপই কি তার শেষ বিশ্বকাপ ছিল? জবাবে তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বকাপটির মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি। কারণ হয়তো এটাই ছিল আমার শেষ বিশ্বকাপ। আমি মনে করি হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ ছিল। আর একটি বিশ্বকাপ টেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
আর্জেন্টিনার জার্সিতে সেঞ্চুরি বা ১০০ ম্যাচের মাইলফলক ছোঁয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। সে প্রসঙ্গে অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে ১০০টি ম্যাচ খেলার স্বপ্ন আমার ছিল, তবে মনে হয় না আমি সেখানে পৌঁছাতে পারব।’
খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানার পর কোচিং পেশায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তালিয়াফিকোর। তবে বর্তমান আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তন এবং তরুণ ফুটবলারদের মানসিকতা নিয়ে নিজের ভাবনার কথাও প্রকাশ করেছেন তিনি। কোচিং কোর্স প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কোচ হওয়ার জন্য কোর্স করছি, তবে দিন দিন এটি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ফুটবলাররা বদলে গেছে; এখনকার তরুণ খেলোয়াড়েরা নিজেদের অনেক বেশি তারকা মনে করে।’
একটি সোনালি যুগের সাক্ষী হয়ে এবং শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার তৃপ্তি নিয়েই যেন আর্জেন্টিনা দলকে বিদায় জানানোর পথে এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার।