তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অটোরিকশা চালকদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে উসকে দিয়ে স্কয়ার ভবনে হামলা চালানো হয় এবং সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কেট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে উত্তরা এলাকায় অটোরিকশার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এসব চালকদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে অটোরিকশা চালকরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহত্তর উত্তরা এলাকায় বর্তমানে এক লাখেরও বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। লাইসেন্সবিহীন ও বিশৃঙ্খলভাবে চলা ব্যাটারিচালিত এসব অটোরিকশা পুরো উত্তরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। তাদের কারণে বিমানবন্দর মহাসড়ক ও বিভিন্ন সেক্টরে প্রায়ই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে চাকরিজীবীরা প্রতিনিয়ত কর্মঘণ্টা নষ্ট করছেন। পাশাপাশি স্কুল-কলেজগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজনৈতিক আশ্রয়ে এসব অটোরিকশার বিস্তারের ফলে চালকরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে গেলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মব তৈরি করে যাত্রীদের হয়রানি ও নাজেহাল করে।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে তারা উত্তরা স্কয়ার ভবনে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাকে উল্লেখ করেন। গতকাল রাত সাড়ে ১১টার পর কয়েক দফা হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা স্কয়ার ভবনের দুই পাশের কাচ, দরজা-জানালা ও দোকানপাট ভাঙচুর করে এবং লুটপাট চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে তারা প্রশাসনের কোনো নির্দেশই মানতে রাজি হয়নি। একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই গভীর রাত পর্যন্ত মার্কেটজুড়ে তাণ্ডব চালাতে থাকে তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেট কর্তৃপক্ষের কয়েকজন জানান, অটোরিকশা চালকদের হামলায় দোকানদারদের প্রায় কোটি টাকার মালামাল লুটপাট ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা বলেন, ভবনের এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে এক রিকশাচালকের কথা কাটাকাটি থেকেই মূলত উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, ঘটনার রাতেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ সময় সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পুরো ভবন ঘুরে দেখেন। তারা জানান, ভবনের প্রতিটি অংশ তল্লাশি করেও কোথাও কোনো লাশ পাওয়া যায়নি। তাদের ভাষ্য, যেখানে কাউকে হত্যা করা হয়নি সেখানে লাশ থাকার প্রশ্নই আসে না। তারা অভিযোগ করেন, দুর্বৃত্তরা মূলত লুটপাটের উদ্দেশ্যে ঘটনাটি সাজিয়েছে। হামলাকারীরা ভবনের নিচতলার শোরুমগুলোর কাচ ভেঙে চুরমার করে এবং কয়েকজনকে মারধর করে আহত করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দোকান থেকে মালামাল লুটপাট করা হয়।
উত্তরা স্কয়ার বিল্ডিংয়ে হামলার ঘটনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শাহরিয়ার আলী জানান, একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুরো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, এক যাত্রী মার্কেটের ভেতরে কিছু জিনিস রেখে গেলে তা নিতে তিনি আবার ফিরে আসেন। সে সময় তার রিকশাটি মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। রিকশাটি সরাতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মী রিকশাচালককে ধাক্কা দেন বা লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও জানান, পরে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে একজনকে মারধর করে হত্যা করা হয়েছে এবং তার লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই গুজবকে কেন্দ্র করে অনেক লোকজন জড়ো হয়ে মার্কেটে ভাঙচুর ও হামলা চালায়। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি দুষ্কৃতিকারী চক্র লুটপাটের চেষ্টা করেছে বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ বা নিহত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা এবং উস্কানিদাতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে উত্তরা অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আবু বক্কর বলেন, তাদের সংগঠন সব সময় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উত্তরা এলাকাকে নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখতে কাজ করে আসছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটিতে একজন রিকশাচালককে মারধর করার একটি ভিডিও তাদের কাছে রয়েছে। ভিডিওটি দেখার পর অনেক চালক আবেগপ্রবণ হয়ে সেখানে জড়ো হন।
তবে তিনি বলেন, পরে একটি কুচক্রী মহল পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে এবং চালকদের উস্কানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তাদের প্রাথমিক তদন্তে উত্তরা এলাকার প্রায় ৪০০টি গ্যারেজে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে কোনো চালক নিহত হননি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বহিরাগত একটি সিন্ডিকেট অটোরিকশার তার কেটে দেওয়া এবং নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে এবং কোনো আন্দোলন বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাদের সংগঠন প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে বলেও তিনি জানান।