একদিন না একদিন শেষ হতে হয়। থেমে যেতে হয় দৌড়, নীরব হতে হয় গ্যালারি, খুলে রাখতে হয় জার্সিও। কিন্তু কিছু বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়- একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, অপেক্ষা আর ভালোবাসারও সমাপ্তি। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষটাও তেমনই।
যে জার্সিতে একসময় ছিল কেবল প্রতিশ্রুতি, সেই আকাশি-সাদা জার্সিতেই মেসি পেয়েছেন কান্না, পেয়েছেন অপমান, পেয়েছেন অসংখ্য ব্যর্থতার ভার। আবার সেই জার্সিতেই শেষ পর্যন্ত ছুঁয়েছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন পৃথিবীর ছাদে। কোপা আমেরিকার শিরোপা তুলেছেন। ফিনালিসিমার মঞ্চেও হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে ছুটেছেন যে মানুষটি, তিনি বললেন-এবার থামার সময়। সোমবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৯ বর্ষী মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পরই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০ বছরের বেশি সময়ের আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের ইতি টানলেন এলএমটেন।
আর্জেন্টিনার মূল দলে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালের আগস্টে। শুরুটা অবশ্য ছিল সুখের নয়-হাঙ্গেরির বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে লাল কার্ড দেখেছিলেন ১৮ বর্ষী মেসি। কিন্তু সেই ক্ষত থেকেই হয়ে উঠলেন বিশ্বসেরা, পরবর্তী দুই দশক রাঙিয়েছেন ফুটবলের মঞ্চ। হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলার। জাতীয় দলের হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলে করেছেন ১২৫ গোল। অ্যাসিস্ট করেছেন ৬৮ গোলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তো বটেই, লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়দের মধ্যেও আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ডও তার দখলে।
মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের প্রথম এক দশক ছিল অদ্ভুত এক অপেক্ষা আর হতাশার গল্প। ২০০৭ কোপা আমেরিকায় ফাইনালে উঠেও ব্রাজিলের কাছে হেরে রানার্সআপ। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হার। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬- পরপর দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। চারটি বড় ফাইনাল। চারবারই হতাশা। সমালোচনার তীর তখন মেসির দিকেই। ক্লাব ফুটবলে একের পর এক শিরোপা জিতলেও আর্জেন্টিনার হয়ে যেন সবকিছু অধরা। এমনকি ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন। আর সেই প্রত্যাবর্তনই বদলে দেয় আর্জেন্টিনার ইতিহাস।
এরপর আসে ২০২১ কোপা আমেরিকা। অবশেষে অপেক্ষার অবসান কিংবদন্তির। মারাকানায় ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছরের বড় শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। মেসির হাতেও ওঠে প্রথম বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি। সেবার মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন।
পরের বছরটি যেন ছিল স্বপ্নের মত। কাতার বিশ্বকাপের শুরুটা ভালো ছিল না। সৌদি আরবের কাছে হারের ধাক্কা দিয়ে শুরু। কিন্তু সেখান থেকে মেসির আর্জেন্টিনা এগিয়েছে ইতিহাস লেখার পথে। মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া- সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ফ্রান্স। দুই গোল মেসির। অতিরিক্ত সময়ে আরও এক গোল। টাইব্রেকারে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনায়। আর মেসির হাতে সেই ট্রফি, যেটির জন্য তার ক্যারিয়ারজুড়ে ছিল সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলও জেতেন মেসি। ২০১৪ ও ২০২২, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতার রেকর্ড গড়েন।
বিশ্বকাপের আগে ২০২২ সালে আরেকটি ট্রফিও এসেছিল। মেসির নেতৃত্বে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমায় ৩-০ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ওঠে দ্বিতীয় কোপা আমেরিকার ট্রফি।
২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি ম্যাজিকে আর্জেন্টিনা ফাইনালে খেলে। এবার খালি হাতেই ফিরতে হয়। অতিরিক্ত সময়ে ফেররান তরেসের গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। আসরে ৮ ম্যাচে ৮ গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট করেন। আর মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হয় ৬ আসরে ৩৪ ম্যাচ, ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট নিয়ে।
বিশ্বকাপে মেসির সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর মধ্যে আছে-সর্বাধিক ম্যাচ (৩৪), ২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট এবং তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়ক হিসেবে শুরু করা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে পাঁচটি ট্রফি জিতেছেন মেসি। দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা ও একটি বিশ্বকাপ এবং সঙ্গে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছেন, ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে। এছাড়া আরও ২০০৫ সালে যুব দলের হয়ে জেতেন ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ব্যক্তিগত অর্জনেও অনন্য মেসি। ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট, ২০০৭ কোপা আমেরিকার সেরা তরুণ খেলোয়াড়, ২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল, ২০১৫ ও ২০২১ কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়, ২০২২ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জেতেন কিংবদন্তি। মেসিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুইবার গোল্ডেন বল জেতা একমাত্র ফুটবলার। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার ২১ গোল আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ, ৩৪ ম্যাচও রেকর্ড।
মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়কে শুধু ট্রফি দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। রেকর্ডের পাতাতেও তিনি রেখে গেছেন নিজের নাম।