চারশ অ্যাথলেট থেকে তিন হাজারের বেশি। ছয়টি খেলা থেকে ১৯টি খেলার বিশাল আয়োজন। ৫৯টি পদক ইভেন্ট থেকে দুই শতাধিকের বেশি। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাস মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সীমা ভাঙার এক মহাকাব্য।

একটি স্টার্টিং ব্লক, একটি সুইমিং পুল, একটি বক্সিং রিং কিংবা একটি সবুজ মাঠ—প্রায় এক শতাব্দী ধরে এসব মঞ্চে লেখা হয়েছে হাজারো মানুষের জীবনের গল্প। কেউ হয়েছেন কিংবদন্তি, কেউবা হারিয়ে গেছেন সময়ের স্রোতে।

১৯৩০ সালে কানাডার হ্যামিল্টনে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। নাম ছিল ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস’। ১১টি দেশ, প্রায় ৪০০ অ্যাথলেট, ছয়টি খেলা ও ৫৯টি পদক ইভেন্ট নিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট আয়োজনের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। ইংল্যান্ডের সাঁতারু জয়েস কুপার চারটি স্বর্ণ জিতে প্রথম আসরের উজ্জ্বল মুখ হয়েছিলেন। কেউ তখন ভাবেনি, এই বীজ একদিন বিশ্বের অন্যতম বড় বহু-ক্রীড়া আসরে পরিণত হবে।

১৯৩৪ সালে লন্ডন আসরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করে। ১৯৩৮ সালে সিডনি গেমসের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে থেমে যায় আয়োজন। ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের নির্ধারিত আসর আর হয়নি। পৃথিবী যখন যুদ্ধের ক্ষত সামলাচ্ছিল।

১৯৫০ সালে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে ১২ বছর পর আবার ফিরে আসে কমনওয়েলথ গেমস। এরপর ১৯৫৪ সালের ভ্যাঙ্কুভার গেমসে জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত’মিরাকল মাইল’। ইংল্যান্ডের রজার ব্যানিস্টার ও অস্ট্রেলিয়ার জন ল্যান্ডি প্রথম চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দৌড়ানো দুই কিংবদন্তি। মুখোমুখি লড়াইয়ে ব্যানিস্টারের জয় আজও কমনওয়েলথ ইতিহাসের অমর অধ্যায়।

১৯৫৮ সালের কার্ডিফ, ১৯৬২ সালের পার্থ, ১৯৬৬ সালের কিংস্টনের প্রতিটি আসরেই বাড়তে থাকে অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার মান। ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রথমবার গেমস আয়োজন করে কিংস্টন নতুন আবেগ যোগ করেছিল। ১৯৭০ সালের এডিনবরা গেমসে যুক্ত হয় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। মেট্রিক দূরত্ব ও ইলেকট্রনিক ফটো ফিনিশ ব্যবহারের মাধ্যমে গেমস প্রবেশ করে নতুন যুগে।

১৯৭৮ সালের এডমন্টন আসরে স্থায়ী হয় ‘কমনওয়েলথ গেমস’ নামটি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছায়া পেরিয়ে এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় স্বাধীন দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া পরিবারের উৎসবে।

১৯৮৬ সালের এডিনবরা গেমসে বয়কটের কারণে অনেক দেশ অংশ নেয়নি। ১৯৯০ সালের অকল্যান্ড গেমসের মাধ্যমে আবার পূর্ণতা ফিরে পায় আয়োজন। ১৯৯৪ সালের ভিক্টোরিয়া গেমসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যাবর্তন ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। বর্ণবাদের দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে দেশটি।

১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে প্রথমবার এশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় কমনওয়েলথ গেমস। যুক্ত হয় দলীয় খেলা। ক্রিকেট, হকি, নেটবল ও রাগবি সেভেনস নতুন দর্শক তৈরি করে। রাগবি মাঠে নিউজিল্যান্ডের জোনাহ লোমুর দাপট ছিল সেই আসরের অন্যতম স্মৃতি।

২০০২ সালের ম্যানচেস্টার গেমসে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। প্রথমবার প্যারা অ্যাথলেটরা জাতীয় দলের সদস্য হিসেবে মূল গেমসে অংশ নেন। অন্তর্ভুক্তির নতুন অধ্যায় শুরু হয় এখান থেকেই।

২০০৬ সালের মেলবোর্ন, ২০১০ সালের দিল্লীতে নতুন তারকার জন্ম হয়েছে। দিল্লিতে ভারতের ব্যাডমিন্টন তারকা সাইনা নেহওয়ালের স্বর্ণজয় স্বাগতিকদের আবেগের চূড়ান্ত মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।

২০১৪ সালে গ্লাসগো প্রথমবার কমনওয়েলথের বড় মঞ্চে নিজের পরিচয় নতুন করে তুলে ধরে। ৭১টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার অ্যাথলেটের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই আসর শহরকে পরিণত করেছিল উৎসবের নগরীতে। সাঁতারু রস মারডক ঘরের দর্শকদের সামনে স্বর্ণ জিতেছিলেন। জ্যামাইকার উসাইন বোল্ট ৪x১০০ মিটার রিলেতে স্বর্ণ জিতে গ্যালারি মাতিয়েছিলেন।

২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট গেমস ছিল সমতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার নারী ও পুরুষের সমানসংখ্যক পদক ইভেন্ট রাখা হয়। ২০২২ সালের বার্মিংহাম গেমসে প্যারা স্পোর্ট আরও বড় জায়গা পায়। অস্ট্রেলিয়ার আরিয়ার্ন টিটমাস, জ্যামাইকার এলেইন থম্পসন-হেরা, পাকিস্তানের আরশাদ নাদিম ও স্কটল্যান্ডের আইলিশ ম্যাককলগানের পারফরম্যান্স সেই আসরের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়।

এবার ইতিহাস আবার ফিরছে স্কটল্যান্ডে। অংশ নেবে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চল। তিন হাজারের বেশি অ্যাথলেট লড়বেন ১০টি খেলা ও ছয়টি প্যারা স্পোর্টে। ২৩ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ১১ দিনের এই আয়োজন হবে নতুন গল্প তৈরির মঞ্চ।

১৯৩০ থেকে ২০২৬। হ্যামিল্টন থেকে গ্লাসগো। মাঝখানে বদলেছে পৃথিবী। বদলেছে দেশ,খেলা ও পদকের সংখ্যা। নারীরা প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের মঞ্চে এসেছেন। প্যারা অ্যাথলেটরা ভেঙেছেন আলাদা থাকার দেয়াল। বদলায়নি মানুষের জয়ের আকাঙ্ক্ষা। কারও হাতে উঠেছে স্বর্ণপদক। কেউ ফিরেছেন খালি হাতে।

প্রায় এক শতাব্দী আগে হ্যামিল্টনে চারশ অ্যাথলেট যে স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলেন, সেই স্বপ্ন আবার জীবন্ত হবে গ্লাসগোয়। আলো জ্বলবে। স্টার্টারের বন্দুক বাজবে।

কেউ ছুটবে, কেউ সাঁতরাবে, কেউ লড়বে নিজের সীমার সঙ্গে।ইতিহাস অপেক্ষা করবে নতুন একটি নাম লেখার জন্য।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews