আধুনিক যুগে খাদ্য নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এ সময়ে যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি উদীয়মান কৃষি শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে আর্থিক সম্পদ ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অধিকারী উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ((GCC) দেশগুলোর মধ্যে একটি অনন্য পরিপূরক সম্পর্ক পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ আজ খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধান, মাছ এবং সবজি উৎপাদনকারী দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। উর্বর মাটি এবং পানিসম্পদের প্রাচুর্যের কারণে বাংলাদেশে কৃষির ব্যাপক বিস্তার এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের মোট পরিবারের প্রায় ৪৬.৬ ভাগ কৃষিনির্ভর। বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক নীতি গ্রহণ করেছে, যা খাদ্য উৎস বহুমুখীকরণে আগ্রহী উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশকে একটি আদর্শ গন্তব্যে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত পরবর্তী সরকার নিশ্চয়ই সেই গন্তব্যে পৌঁছতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। উল্লেখ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি রপ্তানির মূল্য ছিল ৯৮৯ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ২.০৫ ভাগ। এর মধ্যে শুধু প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি থেকেই ২০২৪ অর্থবছরে আয় হয়েছে প্রায় ৩৪১.৭৩ মিলিয়ন ডলার। খাদ্য নিরাপত্তার এ সাফল্য আকস্মিক নয়, বরং এটি সম্ভব হয়েছে গ্রামীণ ক্ষমতায়ন এবং স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্বারোপ করা কৃষি ও উন্নয়নমূলক নীতির মাধ্যমে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এ সম্ভাবনা আরও এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (১৯৭৭-১৯৮১) : বাংলাদেশকে সাহায্যনির্ভর দেশ থেকে স্বনির্ভর দেশে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে তাঁর কৌশলকে ‘বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। টেকসই সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি দেশজুড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পরিষ্কারের এক জাতীয় অভিযান শুরু করেন। উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সারের ব্যবহার এবং বহুমুখী সেচ প্রযুক্তির প্রসারে তিনি ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন। কৃষকরা যাতে তাদের পানিসম্পদ ও কৃষিব্যবস্থাপনা নিজেরাই করতে পারে, সে লক্ষ্যে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের ভিত্তি হিসেবে ‘গ্রাম সরকার’ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হয়, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি স্থাপন করে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া (প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) খাদ্য নিরাপত্তাকে শিক্ষা এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে এ ধারা অব্যাহত রাখেন। তার আমলে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ফলে খাদ্যমূল্য স্থিতিশীল হয় এবং নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিএনপি চেয়ারম্যান ভবিষ্যৎ ভিশনের অংশ হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের কাছে সরাসরি সহায়তা, ঋণ এবং বিমাসুবিধা পৌঁছে দিতে ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’-এর উদ্যোগ, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে ১.৩ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এই সম্মিলিত উদ্যোগগুলোর লক্ষ্য কৃষকদের ক্ষমতায়ন, কৃষি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। বাংলাদেশের এই দৃঢ় ভিত্তি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা সহযোগিতার পরিকল্পনা প্রণয়নে আত্মবিশ্বাস জোগায়।

উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এ কারণেই তারা ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ‘ভিশন ২০৩৫’-এর আওতায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈদেশিক অংশীদারি খুঁজছে। বাংলাদেশে কৃষিজমিতে বিনিয়োগ বা যৌথ উদ্যোগে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিশ্ববাজারের মূল্যের ওঠানামা এবং শিপিং জটিলতা থেকে সরাসরি সুরক্ষা প্রদান করবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব বৃহত্তম খাদ্য আমদানিকারক। দেশটি বাংলাদেশ থেকে বছরে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি করে, যা ভিশন ২০৩০-এর অধীনে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। জিসিসি দেশগুলোর মূল লক্ষ্য হলো তাদের খাদ্য আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং ঐতিহ্যগত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো।

উপসাগরীয় তহবিলগুলো কৃষি ব্যয় কমাতে টেকসই সেচব্যবস্থার আলোকে সৌরচালিত সেচ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। এ ছাড়া ধান ও ভুট্টার মতো কৌশলগত ফসলে পানির সাশ্রয় করতে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ছোট বাঁধ ও খাল নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ছে। আবুধাবি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (ADFD) ইতোমধ্যে বেশ কিছু অবকাঠামো প্রকল্পে এ ধরনের সহায়তা প্রদান করছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এতে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে আগের সুদৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তি জিসিসি দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনায় আত্মবিশ্বাস জোগায়। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্য চাহিদার জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে কৃষিজমিতে বিনিয়োগ বা যৌথ খাদ্যশিল্প স্থাপন উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামা এবং শিপিং জটিলতা থেকে সরাসরি সুরক্ষা প্রদান করে।

সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তম খাদ্য আমদানিকারক। দেশটি প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি করে। ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। আমদানির দিক থেকে আরব আমিরাত দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

উপসাগরীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি কৃষকদের সঙ্গে নির্দিষ্ট ফসল (যেমন বাসমতী চাল, শস্য এবং ডাল) চাষের জন্য চুক্তি করতে পারে, যা সরাসরি উপসাগরীয় বাজারে রপ্তানি করা হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে ধান উৎপাদন ৩৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি বিশাল উদ্বৃত্ত সরবরাহ নিশ্চিত করবে, যেখানে চাল একটি প্রধান খাদ্যপণ্য। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্য চাহিদার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ আমদানি করে।

বাজারের আকার : ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, জিসিসি দেশগুলোর বার্ষিক খাদ্য আমদানির মূল্য ৫৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) নিশ্চিত করা এখন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অপরিহার্যতা। যা নবনির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সম্ভব।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ : বিদেশি মূলধন প্রবেশ সহজতর করা এবং কর রেয়াতসহ বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি সংস্থা।

ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক : ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যৌথ খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নে এই ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

বিনিয়োগ বিনিময় কর্মসূচিগুলো সক্রিয় করা, যার লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন ও প্রযুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশকে জিসিসি বাজারের জন্য একটি ‘খাদ্য ভান্ডারে’ রূপান্তরিত করা। কৃষি প্রযুক্তি: পানি-সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জৈবসার এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল বীজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়।

বাংলাদেশের জন্য এই বিনিয়োগগুলো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসবে, হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং গ্রামীণ খাতে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেবে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের পণ্য পাবে, একটি সংক্ষিপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করবে এবং তাদের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের (যেমন সার) জন্য নতুন বাজার খুঁজে পাবে। বিরাট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও লজিস্টিক অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (যেমন বাংলাদেশে বন্যা) এই অংশীদারির পথে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে সরকারগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ সুরক্ষা ও উৎসাহদান চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এ বাধাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। বাংলাদেশের সঙ্গে জিসিসি বন্দরগুলোর সরাসরি শিপিং লাইন ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে। উভয় পক্ষের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবসায়িক কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে।

পরিশেষে বাংলাদেশ এবং জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগ কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি পরিবর্তনশীল বিশ্বে টিকে থাকা এবং সমৃদ্ধির জন্য একটি কৌশলগত জোট। উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘মূলধন’ এবং  বাংলাদেশের ‘উর্বর ভূমি ও জনশক্তি’ কাজে লাগিয়ে  ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার’ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব, যা সংশ্লিষ্ট সব জনগণের জন্য স্বনির্ভরতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করবে। বিএনপি সরকারের আমলে খাদ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

লেখক : উপদেষ্টা, বিএনপি চেয়ারম্যান ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews