ড. সৈয়দ আলী তারেক
বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক সংহতির বিরল মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাষ্ট্রকে এখন কেবল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নয়; বরং সেগুলোকে পুনর্গঠনের জন্য আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন সুযোগ স্থায়ী নয়। এগুলো হয় কাঠামোগত সংস্কারে রূপ নেয়, নয়তো ক্রমবর্ধমান ছোটখাটো পরিবর্তনের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, যা মূল ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ন রাখে। শিক্ষাক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে গভীর হবে। কারণ এখানেই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক গতিশীলতার ভিত্তি তৈরি হয়।

বর্তমানে প্রস্তাবিত সংস্কার কর্মসূচি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক কারিগরি প্রশিক্ষণ চালু করা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকেন্দ্রীকরণ এবং গবেষণা সক্ষমতা জোরদার করার মতো উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাপটি জ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকে অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও রফতানি প্রবৃদ্ধি গতি এনে দিয়েছে। এই গতি ধরে রাখতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে আরো গভীর বিনিয়োগ দরকার। তবে উচ্চাভিলাষ একাই কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটায় না। শিক্ষাব্যবস্থা একটি জটিল কাঠামো, যা প্রণোদনা, সামাজিক মানদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শৃঙ্খলাপূর্ণ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া সুপরিকল্পিত উদ্যোগও অন্তর্নিহিত অদক্ষতা দূর করতে ব্যর্থ হতে পারে।

বাংলাদেশে প্রচেষ্টার অভাব নেই। সীমিত সম্পদের মধ্যেও শিক্ষকরা অসাধারণ নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন। শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার একাডেমিক সাফল্যের জন্য বিপুল সময় ও ব্যক্তিগত ব্যয় বিনিয়োগ করে। কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে প্রণোদনা ব্যবস্থায়, যা আচরণকে প্রভাবিত করে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাগুলো শিক্ষাগত প্রণোদনার মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কর্মসংস্থান সম্ভাবনা এবং সামাজিক গতিশীলতা সব কিছুই এই ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।

যখন পরীক্ষাগুলো যুক্তির চেয়ে মুখস্থবিদ্যাকে পুরস্কৃত করে, তখন শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করা ছাড়া বিকল্প থাকে না। এটি ‘ব্যাকওয়াশ ইফেক্ট’-এর নিখুঁত উদাহরণ : পরীক্ষা শুধু শেখার মূল্যায়ন করে না; শেখার ধরনকেও নির্ধারণ করে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা শ্রেণিকক্ষে টিকে থাকার প্রবৃত্তি সৃষ্টি করে, ফলে শিক্ষকরা বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার পরিবর্তে মুখস্থ শেখানোকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হন। যদি ব্যবস্থা স্মৃতিনির্ভর পুনরাবৃত্তিকে পুরস্কৃত করে, তবে তা চিন্তাবিদের পরিবর্তে রেকর্ডকারী তৈরি করতেই থাকবে।

এটি সাংস্কৃতিক ঘাটতির প্রশ্ন নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক নকশার প্রশ্ন। প্রকৃত রূপান্তরের জন্য মূল্যায়ন ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। ’২১ শতাব্দীর চাহিদা পূরণে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষাগুলোর বিবর্তন অপরিহার্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের যুগে মুখস্থবিদ্যা শুধু অপ্রচলিত নয় এটি একাডেমিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশ্লেষণধর্মী যুক্তি, প্রয়োগভিত্তিক সমস্যা সমাধান, কাঠামোবদ্ধ লেখালেখি এবং ধারণাগত দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে পরীক্ষার সংস্কার পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রণোদনাকে পুনঃসামঞ্জস্য করতে পারে। মানসম্মত মূল্যায়ন প্রটোকল এবং স্বচ্ছ বেঞ্চমার্কিং প্রবর্তন বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং জনআস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। এই মূল্যায়ন মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণ ছাড়া নতুন প্রযুক্তি, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ বা সম্প্রসারিত পাঠ্যক্রম বিদ্যমান বিকৃতিগুলোকে কেবল ডিজিটাল রূপেই পুনরুৎপাদন করবে।

তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সফল হতে পারে না। বাংলা ভাষায় সাক্ষরতা কেবল পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণধর্মী যুক্তি এবং স্পষ্ট, প্রভাবশালী প্রকাশভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে ইংরেজি শিক্ষা ব্যাকরণ বা শব্দভাণ্ডার মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পেশাগত যোগাযোগ, গবেষণা এবং সমস্যা সমাধানের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হওয়া উচিত। বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষতা ছাড়া তৃতীয় ভাষা প্রবর্তন তিনটি ভাষাতেই দুর্বল একটা শ্রেণী তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে দক্ষ ভাষা শিক্ষকের ঘাটতিও একটি বাস্তবতা। অতিরিক্ত ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিভাবে পৌঁছবে তা সতর্কভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যথায়, এই কর্মসূচি কেবল শহর বা সচ্ছল অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উপকারে আসবে এবং বিদ্যমান বৈষম্য আরো বাড়াবে। তাই ভাষা সংস্কারের সাথে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং অবকাঠামো পরিকল্পনা যুক্ত থাকতে হবে। সর্বোত্তম পথ হলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন। প্রথমে নির্বাচিত জেলায় পাইলট প্রকল্প চালু করতে হবে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরে তার সম্প্রসারণ করতে হবে।

গুণগত মানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে, ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। দেশব্যাপী ভাষা ক্লাব, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ডিজিটাল কনটেন্ট এবং কঠোর শিক্ষক সার্টিফিকেশন মানদণ্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে সরকার একটি প্রতীকী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সুযোগে রূপ দিতে পারে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাবলেট’, সম্প্রসারিত ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ এবং কেন্দ্রীভূত শিক্ষার্থী ডাটাবেসের মতো ডিজিটাল উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, গবেষণা বলছে- শুধু হার্ডওয়্যার বিতরণ শিক্ষার ফলাফল উন্নত করে না। প্রযুক্তি বিদ্যমান শিক্ষাদানের ধরনকেই প্রসারিত করে। তাই প্রযুক্তি প্রয়োগের সাথে শিক্ষক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। একই সাথে কেন্দ্রীয় ডাটা সিস্টেমে গোপনীয়তা সুরক্ষা, এনক্রিপশন এবং তদারকি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা চালুর লক্ষ্য হলো একাডেমিক অর্জন বৃদ্ধির সাথে সাথে দক্ষতার ঘাটতি দূর করা। তৈরী পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যাল, জাহাজ নির্মাণ, আইসিটি সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতগুলোতে ব্যবহারিক দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু এসব বিষয় যদি তাত্ত্বিকভাবে পড়ানো হয়, তবে লক্ষ্য পূরণ হবে না। শিল্প খাত-সহযোগিতায় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচি অপরিহার্য।

মাদরাসা আধুনিকীকরণও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে। আইসিটি ও কারিগরি বিষয় সংযোজনের মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই সুযোগ সম্প্রসারণ সম্ভব। তবে শিক্ষাগত সনদের মান ও সমমান নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ একাডেমিক মানদণ্ড প্রয়োজন।

শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বরাদ্দের কৌশলই ফলাফল নির্ধারণ করবে। মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন, প্রাথমিক সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিল উচ্চ বিনিয়োগ ফল দিতে পারে।

উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ভর্তির হার বাড়লেও গুণগত মান সমানতালে বাড়েনি। স্বীকৃতি প্রক্রিয়া অসম, শিক্ষক নিয়োগ মানদণ্ড বৈচিত্র্যময় এবং গবেষণা আউটপুট তুলনামূলকভাবে কম। একটি স্বচ্ছ জাতীয় র‌্যাংকিং কাঠামো জবাবদিহিতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশের জনমিতিক সুফল চিরস্থায়ী নয়। আগামী দশকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার স্থিতিশীল হতে পারে, ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বেশি নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতার ওপর। শিক্ষা সংস্কার তাই শুধু সামাজিক অগ্রাধিকার নয়, অর্থনৈতিক কৌশলেরও কেন্দ্রবিন্দু।

সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আইন প্রণয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংস্কারের জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ। শিক্ষক সংগঠন, শিল্প খাত এবং নাগরিক সমাজের সাথে সমন্বয় ছাড়া এই পরিবর্তন টেকসই হবে না।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রফতানি প্রবৃদ্ধি এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বারবার স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কার আরো জটিল একটি চ্যালেঞ্জ। এর মাধ্যমে জাতির বৌদ্ধিক ভিত্তিকে পুনর্গঠন করা হয়। আজকের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের দায়িত্ববান নাগরিক। তাদের বিশ্লেষণী দক্ষতা, কারিগরি সক্ষমতা এবং নৈতিক ভিত্তিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথ, নাগরিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অবস্থান নির্ধারণ করবে।

লেখক : প্রোভিসি, গ্লোবাল নেক্সট ইউনিভার্সিটি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews