ফেনীর দাগনভুঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের তরুণ মোহাম্মদ নাইমুদ্দিন জন্মের চার বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে থামাতে পারেনি। সব বাধা পেরিয়ে তিনি ফেনী সরকারি কলেজ থেকে বিএসএস (ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
উচ্চশিক্ষা শেষ করেও দীর্ঘদিন ধরে একটি চাকরির জন্য সংগ্রাম করছেন তিনি। মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বারবার তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
নাইমুদ্দিন বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে এত স্ট্রাগল করেছি এবং এত কিছু দেখেছি যে সবসময় একটা কথাই মনে হতো—বড় হয়ে আমাকে আমার ফ্যামিলিকে সাপোর্ট দিতে হবে। তাদের জন্য কিছু করতে হবে। আমার বাবা-মা, চাচা ও ভাই-বোনেরা খুবই আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যে আমার একটা চাকরি হবে। আমি তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চাই।’
চাকরির বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে এবং বিকল্প ক্যারিয়ার গড়তে নাইম নিজেকে দক্ষ করে তুলেছেন তথ্য-প্রযুক্তির অন্যতম মাধ্যম গ্রাফিক ডিজাইনে। বর্তমানে তিনি মূলত ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিজাইন’ নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করছেন। তার তৈরি করা বিভিন্ন ব্যানার, পোলো শার্ট বা হুডির আকর্ষণীয় প্রমোশনাল ডিজাইন ও কাজের মান দেখলে সহজেই বোঝা যায়—সৃজনশীলতা, মেধা কিংবা দক্ষতার দিক থেকে তিনি কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।
কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চিত্র হচ্ছে, কাজের চমৎকার পোর্টফোলিও থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান বা আয়ের সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হয়নি তার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করলেও কেবল তার শারীরিক অক্ষমতাকে সামনে রেখে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
হতাশার সুরে নাইম বলেন, ‘একটা মানুষ তো সব দিক থেকে এক্সপার্ট হতে পারে না। কেউ ব্যবসা করবে, কেউ বিদেশ যাবে, আবার কেউ চাকরি করবে। আমি আমার পক্ষ থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। একটি চাকরি এই মুহূর্তে আমার জন্য খুবই জরুরি।’
স্থানীয় সমাজসেবক হাসানুজ্জামান শাহাদাত বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে যে পড়ালেখা চালিয়ে এতদূর পর্যন্ত এগিয়ে আসছে এটি সত্যি আনন্দের বিষয়। আমি সরকার মহোদয় ও অত্র এলাকার এমপি মাননীয় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু মহোদয়ের এ বিষয়ে সদয় সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
দাগনভুঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, ‘মূলত এক্ষেত্রে আমাদের করার বেশি সুযোগ নাই। যদি প্রতিবন্ধী ভাতা সহায়তা লাগে আমরা করতে পারি, কিন্তু চাকরির বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। রাষ্ট্র যদি প্রয়োজন মনে করে সেক্ষেত্রে হয়ত এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে বা পরীক্ষা দিলে যদি টিকে সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী কোটায় হয়তো চাকরি পেতে পারে।’
নাইমুদ্দিনের এই সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি সমাজের প্রতি এক প্রশ্নও ছুড়ে দেয় : আমরা কি সত্যিই মেধা ও দক্ষতাকে মূল্যায়ন করছি, নাকি এখনো শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেই বড় করে দেখছি? শত প্রতিকূলতার মাঝেও নাইম আশাবাদী—কোনো একদিন তার যোগ্যতা দেখে কেউ তাকে সুযোগ দেবেই। আর সেই সুযোগের হাত ধরেই পূরণ হবে তার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আজীবনের লালিত স্বপ্ন।