বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত-সহিংসতার সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে ধরনা ও বিদেশি দূতাবাসগুলোর দ্বারস্থ হওয়ার ইতিহাসও পুরোনো। বিরোধপূর্ণ ও আত্মবিনাশী রাজনৈতিক সংস্কৃতি নানা সময়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ সুযোগ করে দিয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে এই তৎপরতা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে যায়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান থেকে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যবর্তী ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা ৩৪ বছরের দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় আমরা ঘুরেফিরে একই পুনরাবৃত্তি হতে দেখেছি।
অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো (জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী সাবেক মহাসচিব), সুজাতা সিং (ভারতের পররাষ্ট্রসচিব)—এমন নাম আলোচিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে যাওয়া হয়েছে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে। এ রকম বাস্তবতা জনসাধারণের কাছে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে ক্ষমতায় যেতে গেলে বৈশ্বিক অথবা আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন লাগে। এ বিবেচনাতেই কোন দল কোন ‘দেশপন্থী’, সেটা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনার শেষ নেই। ভোটের প্রচারণাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হরদম এই কার্ডের ব্যবহার চলে।
এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটটা অনেকটা ভিন্ন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। নির্বাচনটা হতে যাচ্ছে বিএনপি ও তাদের একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর ১১-দলীয় জোটের মধ্যে। এবারের নির্বাচনে বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসগুলোতে সরাসরি দ্বারস্থ হওয়ার ও হস্তক্ষেপের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তবে নির্বাচনের মাঠে ‘বিদেশিদের দীর্ঘ ছায়া’ সগৌরবেই বিরাজ করছে। সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিও কনটেন্ট আর রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে তা জানান দিচ্ছে। নির্বাচন বাংলাদেশের মাটিতে হলেও প্রচারণার মাঠে দিল্লি, ওয়াশিংটন প্রবলভাবে উপস্থিত। এ ছাড়া ইসলামাবাদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আঙ্কারার নামও।
এবারের নির্বাচন মূলত বয়ান তৈরির লড়াই হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ইশতেহার আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এর বদলে বিভিন্ন আসনে গিয়ে সরাসরি কিছু জনতুষ্টিবাদী প্রতিশ্রুতি দেওয়া চলছে। কিন্তু মূল প্রতিযোগিতা চলছে বয়ান তৈরির মাধ্যমে ভোটারদের মনভূমি দখলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সমসুরের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিও ও ছবি এবং বট বাহিনী—এই চার হলো বয়ান তৈরির কৌশলের অভিন্ন অস্ত্র।