স্বাধীনতার পর অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু রাষ্ট্রের সাথে জনগণের সম্পর্ক আজও ‘মালিক-প্রজা’র মতো, ‘জনগণের রাষ্ট্র’ নয়Ñ কেবল প্রবঞ্চনা। এই বাস্তবতার নিরিখে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে তারেক রহমান বহুবার বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকবে না, কেউ নিপীড়িত হবে না, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের এবং জনগণই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’ সময়ের সাথে সাথে সরকার বদলেছে, দল পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র যাÑ তাই রয়ে গেছে। এজন্য তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা এমন রাজনীতি চাই, যা ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জনগণের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনে। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারলেই আমি মনে করবো, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কিছু অর্জন করেছি।’ কথাগুলো নতুন নয়। শেখ মুজিবুর রহমানও এই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, বলেছিলেন মানুষের ক্ষমতায়নের কথা। ক্ষমতায় এসে অনেক কাজ করতে চাইলেও তার দল, ক্ষমতা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা তা হতে দেয়নি। তাকে এই ব্যর্থতার দায় নিতে হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে জনগণের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেন। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণÑ তাঁর নেতৃত্ব কাঠামোগতভাবে শুরু হয়। সেই সফল্যের মূল্যও তাকে জীবন দিয়ে চুকাতে হয়। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পরে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা পালাক্রমে ক্ষমতায় আসেন। রাষ্ট্রের কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সর্বশেষ, আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে ক্ষমতার এমন এক দানবীয় একচ্ছত্রতা তৈরি হয়েছেÑ যার বিবরণ আজ আর গোপন নয়। ভোটাধিকার বিলীন, প্রশাসন দলীয়করণ, বিরোধীদল ও মত দমন, হত্যা, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচার ব্যবস্থার দুঃসময়, দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তার, এবং রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করাÑ এসব আজ ইতিহাসের নির্মম নথি। ফলে জনগণের বিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় যিনি নতুন করে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তিনি তারেক রহমান। রাজনৈতিক আক্রমণ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, প্রচারযুদ্ধ, মামলা, নির্বাসন, মিথ্যা অপবাদÑ সবকিছুর পরও তিনি একটি কথাই পুনরায় পুনরায় উচ্চারণ করে যাচ্ছেন: ‘আমি মনে করি, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি তখনই কিছু অর্জন করেছি বলতে পারবো, যেদিন বাংলাদেশের জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারবো।’ তিনি রাষ্ট্রকে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, একটি নৈতিক, মানবিক এবং দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তিনি বিশ^াস করেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। দল, সরকার বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মালিক নয়, তারা কেবল দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিচালক। রাজনৈতিক দল নয়, জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। যা দীর্ঘদিনের দলীয়-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে এক মৌলিক চ্যালেঞ্জ। গণঅভ্যুত্থানে জনগণের যে আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তা রাষ্ট্রের বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর দাবি। জনগণ চায়, এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, জনগণের। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারলে গণতন্ত্র অর্থবহ হয়। তারেক রহমান এই সত্যটি উপলব্ধি করেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন গড়ে তুলেছেন। নিশ্চয়ই তিনি সেই পথে হাঁটবেন।

রাজনীতিতে ক্ষমতার আকাক্সক্ষা, জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবহেলা ভুলের রাজনীতির মূল কারণ। নেতারা নিজেদের স্বার্থে দুর্নীতি, অর্থ অপব্যবহার ও বিভাজন সৃষ্টি করেন, যা জনগণের আস্থা কমায়। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সহিষ্ণুতা ও গঠনমূলক বিতর্কের অভাবে বিভাজন বাড়ে, যা দেশের সংকটকে আরো গভীর করে তোলে। এসব ভুলের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি এক অরাজক অবস্থায় আটকে রয়েছে। নতুন প্রজন্ম রাজনীতির জটিলতার চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সঠিক রাষ্ট্রীয় আচরণ পছন্দ করে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। বিএনপি তাদের রাজনৈতিক ভুল ও ভুলের রাজনীতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে বলছে, অতীতের বিভাজন, বিরোধ ও প্রতিশোধের রাজনীতি শেষ করতে হবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

২ মে ২০২৫, তারেক রহমান বলেছেন, ‘লাখো প্রাণের বিনিময় ১৯৭১ এর স্বাধীন বাংলাদেশ, ‘৭৫ এর ৭ নভেম্বরের আধিপত্য বিরোধী তাঁবেদার মুক্ত বাংলাদেশ, ‘৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী বাংলাদেশ এবং ২০২৪ এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন প্রতিটি বাঁকে মানুষ কেন অকাতরে জীবন দিয়েছিল? কি ছিল এই শহীদদের স্বপ্ন? তারা কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিল? একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য ৫৪ বছর বোধ হয় খুব কম সময় নয়, এজন্যই আমি মনে করি, শুধু শহীদদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বোধ হয় শেষ হয়ে যায় না। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল আমরা তাদের সুমহান আত্মত্যাগের প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, ১৯৭১ সাল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার।’
রাষ্ট্র যখন জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে, বিচার বিক্রি হয়ে যায়, দুর্নীতি রাষ্ট্রের রক্তস্রোতে ঢুকে পড়ে, আর মানুষ রূপান্তরিত হয় ‘অধিকারহীন প্রজায়’। গত ৫৪ বছর ঠিক এই চক্রেই ঘুরে বেড়িয়েছে রাষ্ট্র ও রাজনীতি। দল ক্ষমতায় গেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তন হয়নি। মানুষ ভোট চেয়েছে, দল চেয়েছে ক্ষমতা। মানুষ চেয়েছে ন্যায়বিচার, দল চেয়েছে নিজেদের নিরাপত্তা। মানুষ চেয়েছে সমান সুযোগ, দল চেয়েছে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সুবিধা। এই দুঃসময়ের পুঞ্জীভূত ব্যথা আজ মানুষের হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

একজন সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মজুর বা চাকরিজীবী সরকারের কাছে যা চায়, তা খুবই সাধারণ ও ন্যায্য। তারা চায়, প্রতিদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা যেন তাদের পরিবার, স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোনসহ সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে। তাদের সন্তান যেন স্কুলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারে এবং পড়াশুনা শেষে ঘুষ ছাড়াই একটি ভালো চাকরি পায়, হাসপাতালে গেলে উন্নত চিকিৎসা পায় এবং আদালতে ন্যায়বিচার পায়। তারা চায়, সরকার যেন সবার জন্য সমান আইনের ব্যবস্থা করে। তাদের চাওয়া মোটেও বড় কিছু নয়, বরং খুবই মৌলিক এবং ন্যায্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ৫৪ বছরে কোনো সরকার এই সামান্য চাওয়াটুকু পূর্ণ করতে পারেনি।
রাজনীতি যদি মানবকল্যাণের হাতিয়ার না হয়, তা কেবল ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, ‘মানুষের হৃদয়ে জায়গা না করে যে রাজনীতি টিকে থাকতে চায়, তা একসময় শূন্যতায় বিলীন হয়।’ জনগণের আস্থা অর্জনই রাজনীতির আসল সাফল্য। ‘উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়ন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে। উন্নয়ন মানে মানুষের সুযোগ বৃদ্ধি, বৈষম্য কমানো, প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন, এবং রাষ্ট্রের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। তারেক রহমানের দর্শন, সংগ্রাম ও অঙ্গীকার মানুষের কাছে এক নতুন দিশা তৈরি করেছে। কারণ, তার দর্শন হলো রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তার রাজনীতি ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়, মর্যাদা পুনরুদ্ধারের রাজনীতি। তার সংগ্রাম কোনো দলের জন্য নয়, জনগণের জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তার নিজের দলের মধ্যে থাকা দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মী। তিনি আর কত বহিষ্কার করবেন, সতর্ক করবেন! এ দেশ বহু প্রতিশ্রুতি শুনেছে, বহু স্বপ্ন দেখেছে, বহু হতাশা পেয়েছে। মানুষ ক্লান্ত। রাষ্ট্র ক্লান্ত। রাজনীতি ক্লান্ত। কিন্তু আশার কথা হলোÑ একজন নেতা এখনো আছেন, যিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে রাজনীতি মানে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। তিনি বলেছেন যে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, এবং তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম শর্ত। তার কথায়, কাজে, দর্শনে ও সংগ্রামে জনগণের প্রতি যে দায়বদ্ধতা প্রকাশিত হয়েছেÑ তা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপনের সময় এসেছে।
সরকার গঠনের পর থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার অগ্রসর হচ্ছে। এজন্য ১৮০ দিনের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের প্রতিটি অঙ্গনকে আলোকিত করবে। নির্বাচনের আগে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ১০ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৩৭,৫৬৭ পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়েছে। পরে ধাপে ধাপে চার কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা কৃষি ঋণ মওকুপ এবং ২৭,০০০ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এছাড়াও খাল খনন কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। যা অব্যাহত থাকবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সরকারের বাজেটে এসব বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা দেখার বিষয়। দেশে অসংখ্য বেকার তরুণ, একের পর এক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন কর্মসংস্থানের অভাবÑ এসব বাস্তবতা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই এই সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করা প্রয়োজন। এটা জরুরি এবং সময়ের দাবি।

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews