ঋণ করে জমি বন্ধক নিয়ে ধান আবাদ করেছিলেন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘির অনেক কৃষক। ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে পাকা ধানের খেত। কিছু ধান কাটা সম্ভব হলেও ভেজা থাকায় অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন তারা। আবার অনেকে খোরাকির ধানও তুলতে পারেননি। এতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাওড়পারের শত শত প্রান্তিক ও বর্গাচাষি। কৃষকদের অভিযোগ, শ্রমিক ও নৌকা সংকটের পাশাপাশি মজুরি ও ভাড়া বেশি। পানি থেকে তুলে আনা ধানের মূল্যের সঙ্গে খরচের সামঞ্জস্য হচ্ছে না। পচন ও জালা ধরার অজুহাতে ক্রেতারা ধান কিনতে চাইছেন না। কিনলেও দিচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। পারছেন না খেত ফেলে আসতে, না পারছেন ধান তুলতে।

সরেজমিনে জেলার কাউয়াদীঘি হাওড়পারের পশ্চিম ভাগ এলাকায় দেখা যায়, অনেক খেতে ভেজা ধানে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। এক কৃষক এমন ধান দেখিয়ে আক্ষেপ করছিলেন। তিনি বলেন, চোখের সামনে তলিয়ে গেছে পাকা ধানের খেত। যেটুকু জমির ধান কেটে উদ্ধার করা যাচ্ছে, তারও গুণগত মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃষ্টির কারণে ধান পচে যাচ্ছে। অনেক ধানে অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। পচা ধানে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কীভাবে পরিবারপরিজন নিয়ে সারা বছর চলব, আর ঋণ পরিশোধ করব তা বুঝে উঠতে পারছি না। রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম ভাগ এলাকায় দেখা গেছে, কিছুটা রোদ উঠতেই কৃষক ধান বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কেউ আধপাকা ধান কেটে তুলনামূলক উঁচু জায়গায় রাখছেন। কেউ নৌকায় করে কাটা ধান সরাচ্ছেন। কোথাও স্তূপ করা ধানে পচন ধরেছে। কোথাও পানি উঠে ধানের স্তূপ ডুব গেছে। নৌকার অভাবে অনেকের কাটা ধান পানিতেই পড়ে আছে।

কৃষক বলেন, ৪০-৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বড় নৌকার ভাড়া দিতে হয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। ধান বিক্রি করে খরচই উঠছে না। দুই দিন আগেও পানি ছিল না। এখন পানি উঠে গেছে।

উপজেলার পশ্চিম ভাগ এলাকার কৃষক আলমাস মিয়া বলেন, চার কিয়ার (৩০ শতকে ১ কিয়ার) জমি চাষ করেছিলাম। পানির নিচ থেকে ধান কেটে বাড়িতে আনতে খরচ হয়েছে ১৯ হাজার টাকা। যে ধান পেয়েছি বিক্রয় করে পাব না ১০ হাজার টাকাও। রাজনগরের পশ্চিম ভাগ গ্রামের আবদুল আহাদ মিয়া বলেন, ‘ভুক্তি (বন্ধক) নিয়া ১৭৫ কিয়ার খেত করছিলাম। মাত্র ৫ কিয়ার থেকে ধান তুলেছি। কিছু ধান কাটিয়া থইছলাম। ডুবিয়া আঁটি তুলছি। নৌকা নাই। এখন সব পানির মোড়। কিতা যে করি।’ ১৭৫ কিয়ার (বিঘা) জমি আবাদ করতে আমার খরচ হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সব খরচ করেছি ধার দেনা করে। ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন কীভাবে দেনা পরিশোধ করি এই চিন্তায় ঘুম নেই। দিশাহারা হয়ে পড়েছি। উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বর্গাচাষি এরাব মিয়া বলেন ৩০ কিয়ার জমি বর্গা চাষ করেছিলাম। এর মধ্যে ১ কিয়ারও কাটতে পারিনি। এক দিনের বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। জমি আবাদ করতে দাদনে প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়েছিলাম। এখন কীভাবে দাদনের দেনা পরিশোধ করব সে চিন্তায় ঘুম নেই। কাজল পাল বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ধানগুলা সব নষ্ট অইয়া গেছে। গেরা দিছে। আমরার অখন খোরাকি নাই। সব খেত পানির তলে।’ একই ধরনের হাঁহাকার এ অঞ্চলের প্রায় সব কৃষকের।

মৌলভীবাজারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, কৃষকদের ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ২ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওড়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ চললেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো যাচ্ছে না।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews