বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্ত বাজারব্যবস্থা ও সুশাসনের উচ্চকণ্ঠ যুক্তরাষ্ট্র। অন্যান্য সার্বভৌম রাষ্ট্রকে এসব নীতি শেখানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই করে থাকে। তবে তাদের এই নীতিনৈতিকতার বার্তা সব ক্ষেত্রে যে এক থাকে না, তার নজিরও কম নয়। বিশেষ করে, নিজস্ব ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে এসব নীতিকথার উল্টোচিত্রই দেখা যায় বেশি। তার অসংখ্য নজির রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। ভূরাজনৈতিক সুবিধা কিংবা নিজস্ব স্বার্থের অনুকূল মনে করলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে স্বৈরাচার ও ডিকটেটরদের পূর্ণ সমর্থন ও সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কখনো কুণ্ঠাবোধ করেনি। বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনের এই নগ্ন দ্বৈত নীতি বিশ্বজুড়ে সচেতন ও বিবেকবান মানুষের মনে কেবল হতাশাই নয়, বরং তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দেয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্ব াণিজ্যে যে চরম আগ্রাসী ও একপেশে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে অন্য দেশের স্বার্থকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়ার একটি প্রবণতা প্রকট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, ভিসানীতি এবং জোরপূর্বক আরোপিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাসহ বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষলগ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা গভীর অনুধাবনে মূলত একধরনের প্রচ্ছন্ন ‘অধীনতামূলক চুক্তি’। এই চুক্তির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব এখন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে, যার জ্বলন্ত প্রমাণ সহযোগী একটি ইংরেজি দৈনিকে গতকাল প্রকাশিত প্রধান সংবাদটি। যেখানে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও সার্বিক জটিলতায় আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির ব্যয় প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অথচ রাশিয়া, ইউক্রেন, কিংবা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী প্রতিবেশী ভারত থেকে যেখানে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অনেক কম মূল্যে গম কেনা সম্ভব, কিন্তু এই বৈষম্যমূলক বাণিজ্য চুক্তির বাধ্যবাধকতায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বেশি দামে এবং দীর্ঘ পরিবহনের ঝক্কি ও খরচ বহন করে ৮ লাখ টন গম কিনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি সীমিত সক্ষমতার অর্থনীতির দেশ এবং দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে; তাই বাণিজ্য চুক্তির দোহাই দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে চড়া দামে শস্য কিনতে বাধ্য করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত বা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এটি একপ্রকার বাণিজ্য জিম্মিদশা, যার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষকে।

অন্যদিকে, যে পোশাক খাতের বাজার সুবিধা কিংবা অন্যান্য রপ্তানি সুবিধা লাভের আশায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নতিস্বীকার করেছিল, সেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও এখন মার্কিন বাজারে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না; বরং নতুন নতুন শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে রপ্তানি ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একদিকে নিজের পণ্য চড়া দামে ক্রয়ে বাধ্য করা আর অন্যদিকে সুবিধা দেওয়ার নামে বাণিজ্য কমানো- যুক্তরাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের চরম স্বার্থপর ও আগ্রাসী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ বা অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই শোষকসুলভ আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি অবিলম্বে পরিবর্তন করা জরুরি। বিশ্বমঞ্চে প্রকৃত নেতৃস্থানীয় হতে হলে ওয়াশিংটনকে আগ্রাসী মনোভাবের পরিবর্তে গঠনমূলক ও বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু খাদ্যশস্য বা অর্থনৈতিক দিকই নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে করা এই চুক্তির অধীনে বোয়িং বিমান কেনা কিংবা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক প্রযুক্তির সংযোজনসংক্রান্ত যে শর্তগুলো আরোপ করা হয়েছে, তা দেশের সামরিক ও নীতিগত সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’-এর মোড়কে মূলত মার্কিন কর্পোরেশনগুলোকে যন্ত্রাংশ অ্যাসেম্বলিংয়ের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা স্বাবলম্বী প্রযুক্তি তৈরি না করে বরং বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের পথ সুগম করে দেবে। তা ছাড়া বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি চীনের মতো পরীক্ষিত অর্থনৈতিক মিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকে মারাত্মক সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে এবং একটি গণতান্ত্রিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে কেন এমন আত্মঘাতী ও অস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে সই করা হলো, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। এই ধরনের জাতীয় স্পর্শকাতর ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চুক্তিতে সই করার কোনো নীতিগত অধিকার অনির্বাচিত সরকারের থাকা উচিত নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা কেন জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে এমন একপেশে শর্তে সম্মতি দিলেন, তার পেছনে কোনো অদৃশ্য ভূরাজনৈতিক চাপ কিংবা দূরভিসন্ধি লুকিয়ে ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানা এবং সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলা এই চুক্তিটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত অবিলম্বে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনায় চুক্তিটি যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তবে গণতান্ত্রিক সরকারের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে তা পুরোপুরি বাতিল বা সংশোধন করার। তদুপরি, তৎকালীন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের যদি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী স্বার্থ বা দূরভিসন্ধির প্রমাণ মেলে, তবে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ করার অপরাধে তাদেরকেও স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যেতে পারে। কারণ, দেশের অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার চাবি কোনো বিদেশি পরাশক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক টোল কাউন্টারে বন্ধক রাখা যায় না।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews