যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হলেও ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট থাকার পেছনে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নামক এক বিশেষ সামরিক কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই কৌশলের মূল স্থপতি হলেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফরি। ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও দেশটির সামরিক সক্ষমতা ভেঙে না পড়ে।
ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি এই কৌশলকে গত দুই দশকের গবেষণার ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে এই বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
তেহরানের দাবি, এই পদ্ধতির ফলে রাজধানীর ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ বা শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে না। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পরও দেশটির বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে তাদের সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মোজাইক ডিফেন্সের মূল ভিত্তি হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এই তত্ত্বে সমগ্র সামরিক বাহিনীকে একটি একক কমান্ড চেইনের পরিবর্তে ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ডে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি কমান্ড নিজস্ব অস্ত্রাগার, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিট হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন হরমুজ প্রণালিতে কেন যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে না চীন?

এর ফলে যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা কোনো ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ (শীর্ষ নেতা নির্মূল অভিযান)-এর মাধ্যমে মূল নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবুও স্থানীয় ইউনিটগুলো নিজস্ব পরিকল্পনায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
মোহাম্মদ আলী জাফরি ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের দ্রুত পতনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই মডেলটি তৈরি করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রথাগত কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর না-ও হতে পারে। তাই তিনি ইরানকে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছেন যেখানে নিয়মিত বাহিনী, বাসিজ মিলিশিয়া এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
এই কৌশলের আওতায় শুধু ইরানের অভ্যন্তরেই নয়, বরং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক মিত্রদেরও একটি বৃহত্তর প্রতিরোধ বলয়ের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে।
সূত্র: এনডিটিভি।