কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ অভিজ্ঞতার ছয় বছর পরও ভবিষ্যতের কোনও মহামারির আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না কানাডা। বরং পরবর্তী সংক্রামক রোগের মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে দেশটির গবেষণাগারগুলোতে চলছে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেই প্রস্তুতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে মন্ট্রিয়লের পলিটেকনিকের একটি বায়োমেডিসিন ল্যাবরেটরি।
ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে গবেষকদের ব্যস্ততা। সাদা ল্যাব কোট পরা বিজ্ঞানীরা বড় সিরিঞ্জের মাধ্যমে কমলার মতো রঙের একটি দ্রবণ থেকে নমুনা সংগ্রহ করছেন। কোথাও স্বচ্ছ তরল ভর্তি লেবেল লাগানো কাচের বোতল, আবার কোথাও বিভিন্ন ধরনের কোষ ও প্রোটিনের নমুনা রাখা হয়েছে। কম্পিউটার মনিটরে চলছে কোষের অ্যান্টিবডি উৎপাদন সংক্রান্ত বিশ্লেষণ।
- Advertisement -
ল্যাবের অন্য একটি কক্ষে রয়েছে বিশাল আকারের ফ্রিজ। সেখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে প্রোটিন ও কোষের নমুনা ভর্তি অসংখ্য টিউব। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এসব কোষ ও প্রোটিন ব্যবহার করে ভ্যাকসিন এবং বিভিন্ন ধরনের ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
পলিটেকনিকের এই গবেষণা কানাডার ফেডারেল সরকারের ‘র্যাম্প আপ’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে চালু হওয়া এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, দেশের বায়োম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল তা পূরণ করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন ও অন্যান্য বায়োমেডিকেল পণ্য দ্রুত উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা। কোভিড-১৯-এর সময় ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত পণ্যের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি কানাডার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশের অভ্যন্তরে গবেষণা, উৎপাদন এবং দক্ষ জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। র্যাম্প আপ উদ্যোগের আওতায় একাধিক গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। এর অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি লাভাল, ইউনিভার্সিটি দে মন্ট্রিয়ল, এইচইসি মন্ট্রিয়ল, সিমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটি এবং ব্রিজ রিসার্চ কনসোর্টিয়াম।
পলিটেকনিকের প্রধান গবেষক গ্রেগরি ডি ক্রেসেনজোর মতে, পরবর্তী মহামারি ঠিক কবে আসবে বা কোন ধরনের ভাইরাস থেকে তা তৈরি হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে সেই অনিশ্চয়তার কারণেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। গবেষণার ক্ষেত্রে বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং বার্ড ফ্লুর মতো ভাইরাসের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য রোগজীবাণু ও রোগ নিয়েও গবেষণার পরিধি বাড়ানো যেতে পারে। ডি ক্রেসেনজোর মতে, র্যাম্প আপের লক্ষ্য শুধু ভ্যাকসিন তৈরির গতি বাড়ানো নয়। বায়োমেডিকেল গবেষণা ও উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপকে আরও দ্রুত এবং কার্যকর করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদেরও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
কোভিড মহামারির সময় ভ্যাকসিন নিয়ে নানা ধরনের ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করছেন, গবেষণাগারে আসলে কীভাবে ভ্যাকসিন বা ওষুধ তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তা সাধারণ মানুষকে দেখানোও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেসেনজোর আশা, গবেষণার বাস্তব প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে জানানো গেলে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আস্থা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভ্যাকসিন নিয়ে ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কানাডার এই উদ্যোগের লক্ষ্য তাই শুধু পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত থাকা নয়। গবেষণা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে এমন একটি সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনও সংক্রামক রোগ দেখা দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো যায়।
- Advertisement -