বিগত সরকারগুলোর সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক অনুমোদিত এক হাজার ৩০০-এর বেশি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প বর্তমানে রিভিউ বা পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, এসব প্রকল্পের মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রকল্পের কাজ এখনো ১০ শতাংশও বাস্তবায়িত হয়নি।
গতকাল সোমবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের অনেকগুলো প্রকল্পের মধ্যে অপচয় ও দুর্নীতির ইস্যু রয়েছে। এ কারণেই ১,৩০০-এর বেশি প্রকল্প রিভিউয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা এখন যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করছি, সেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা।
ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে বাজার খোঁজার কাজ শুরু হয়েছে
এ দিকে প্রচলিত ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারের বাইরে নতুন বাজার খোঁজার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
জাতীয় সংসদে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবুর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষে শামা ওবায়েদ বলেন, টেকসই ও বহুমুখী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে কাজ করছে এবং একই সাথে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে নতুন বাজার অনুসন্ধান করছে বাংলাদেশ, যাতে রফতানির সুযোগ বাড়ানো যায়।
তিনি আরো বলেন, সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) এবং ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষরের জন্য আলোচনা চলছে, যা রফতানি বৃদ্ধি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে এ সব চুক্তি সম্পন্ন করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রফতানির পণ্যের বহুমুখীকরণকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের রফতানি আয় তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কমাতে বিদেশে বাংলাদেশী মিশনগুলো বাণিজ্য মেলা ও প্রদর্শনী আয়োজন করছে এবং আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিচ্ছে, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাথে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে দেশীয় পণ্য প্রচার ও (ইপিএ) সুবিধা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর পাশাপাশি আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া সহজ করতে জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে সরকার ‘বাংলা বিজ’ পোর্টাল চালু করেছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া কর প্রণোদনা, মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসনের সীমা বৃদ্ধি এবং অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে।
শামা ওবায়েদ জানান, বিডা, বেজা ও বেপজাসহ ছয়টি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে ৩২টি সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিডার ওয়েবসাইট নতুনভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে খাতভিত্তিক তথ্য, বিনিয়োগ প্রণোদনা, যোগাযোগের ঠিকানা ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে বাংলাদেশী মিশনগুলো ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলকে সহায়তা ও কনসুলার সেবা উন্নয়ন এবং বন্দর ও কাস্টমসসংক্রান্ত বিষয়ে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদারে কাজ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, এসব ইতিবাচক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দেশে আরো বেশি বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সহায়ক হবে।
তিনি আরো বলেন, এ সব উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারের জন্য সরকার দেশভিত্তিক বিনিয়োগ রোডশো, সোর্সিং মিটিং, বি-টু-বি ম্যাচমেকিং প্রোগ্রাম ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে প্রবাসী সম্পৃক্ততা কর্মসূচিও জোরদার করা হয়েছে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম আরো বলেন, রফতানি সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে সমন্বয় করে কাজ অব্যাহত রাখবে।
দেশে জ¦ালানির কোনো সঙ্কট নেই
জ্বালানি প্রসঙ্গে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি সঙ্কট নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ চলছে। তিনি আরো বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যেও বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জনের লাশ দেশে ফেরত আনা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে এনেছে সরকার।