পরম করুণাময়, দাতা ও দয়ালু মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তোমাদের পরীক্ষা করব- ভয়ভীতি, ক্ষুধা-অনাহারে, জানমালের ক্ষতিসাধন করে। যারা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করবে তাদের জন্য রয়েছে অবধারিত রহমত ও অপার করুণা (বাক্বারা-১৫৫-১৫৬)।
পৃথিবীর ক্রান্তিলগ্নে উপনীত আমরা। হজরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.)-কে শেষ নবী ঘোষণা করেছেন স্বয়ং আল্লাহপাক। তাঁর আগমনের পর ১৪৪৭ হিজরি সন অতিবাহিত হচ্ছে। এই সময়কালে অনেকের কাছেই পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে, পৃথিবীর প্রশস্ততা বিশাল হওয়া সত্ত্বেও সুইয়ের ছিদ্রের চেয়ে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং নানাবিধ বিপদ-আপদের মধ্যে প্রতিনিয়ত আমরা পতিত হচ্ছি। আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছেন বিপদ-আপদ দিয়ে এবং দূরীকরণার্থে তিনি আমাদের ধৈর্যধারণের উপদেশ দিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তিনি বলেছেন- ১. তোমরা যারা ইমান এনেছ, তারা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আমার সাহায্য প্রার্থনা কর (বাকারা-১৫৩)। যারা ধৈর্যধারণ করেছে এবং করবে, তাদের জন্য বন্ধ দুয়ার তিনি খুলে দেওয়াসহ এমন উৎস থেকে রিজিক দিয়েছেন বা দেবেন যা কল্পনাতীত। মহান রব আরও বলেছেন, ‘হে নবী বলে দিন- আমি বান্দার কাছে আছি, যখন সে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দিই। তাই তাদেরও উচিত আমার আহ্বানে সাড়া দেওয়া (বাকারা-১৮৬)।’
এখানে সালাতের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এজন্য যে সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করার মাধ্যমে সে তার রবের সঙ্গে কথা বলে। আল্লাহর প্রশংসামূলক বাক্য চয়নের দ্বারা তাঁর কাছে দোয়া চায় এবং সিজদায় তাঁর অতি নিকটবর্তী হয়ে প্রার্থনা করে। এখন বিষয় হচ্ছে, আমরা সালাত আদায়কারী হয়েও কেন পূর্ণ ফল লাভ করতে পারছি না? কারণ সব মানুষ একই সালাত আদায় করলেও সালাতের পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন ভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। যেমনটি মুসনাদ সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘নবী (সা.) বলেছেন : একজন মানুষ সালাত আদায় করে অথচ সালাতের সওয়াব হিসেবে কারও জন্য অর্ধেক লেখা হয় অথবা তিন ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ এমন করে ক্রমানুসারে দশ ভাগের এক ভাগ লেখা হয় (আবু দাউদ-৭১৬ মসনাদে আহমদ)।’ নবী (সা.) আরও পরিষ্কার করেছেন যে দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে সালাত আদায় করছে এবং একই পরিমাণ সময় সালাতে অতিবাহিত করছে অথচ তাদের একজন অন্যজনের চেয়ে ১০ গুণ বেশি সওয়াব পাচ্ছে। এর কারণ মূলত তিনটি বিষয়- ১. আল্লাহর জন্য ইখলাস বা একনিষ্ঠা। ২. সালাতে একাগ্র মনোযোগ ও বিনয় এবং তৃতীয়টি হলো, সালাতের বিধিবিধান, সুন্নত ও আদবসমূূহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। সুরা মু’মিনুর-৫৫-৬০-এ বণিত আছে- যখন সে সালাতে দাঁড়াবে, তাকে জানতে হবে কীভাবে পা দুটো সোজা রেখে, কোথায় হাত বাঁধতে হবে। সে যেন অভ্যাসগতভাবে বা কাউকে অনুসরণ করার জন্য হাত না বাঁধে এবং সে যেন মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের অনুসরণ ও আনুগত্যের উদ্দেশ্যে হাত বাঁধে। যখন সে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, সে যেন সিজদার জায়গাতেই দৃষ্টি রাখে কারণ এটিই সুন্নাহ। এই বিষয়াদিতে জ্ঞান তথ্যাদি জানা জরুরি, যা সাহাবায়ে কেরাম রসুল (সা.) বর্ণিত হাদিস দ্বারা স্পষ্ট করেছেন। সালাতের গুরুত্ব কত অধিক, যার প্রমাণ আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘আপনি আপনার পরিবারকে সালাতের আদেশ দিন এবং এর ওপর ধৈর্য ধারণ করুন (ত্বহা-১৩২)। এই আয়াতের মাধ্যমে ফরজ সালাতের পাশাপাশি নফল মুস্তাহাব সালাতের ফরজ ও ওয়াজিবগুলো শেখানোসহ এর সুন্নাত ও আদবগুলো বর্ণনা করতে বলেছেন। ইমাম আহমদ বলেছেন, একজন মুসলিমকে সব ইবাদতেই ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিন্তু মহান আল্লাহ এই আয়াতে সালাতের বিশেষভাবে ইস্তিবার কঠোর ধৈর্য শব্দটির কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু মানুষ আছে যারা নিয়মিত সালাত আদায় করে কিন্তু তাদের কাছে সালাতে একাগ্রতা বজায় রাখা কঠিন মনে হয়। আল্লাহর কালামের অর্থের ওপর গভীরভাবে চিন্তা করা তাদের কাছে ভারী মনে হয় অর্থাৎ সালাতের ভিতরে নফল ও মুস্তাহাব কাজগুলো করা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। একজন মানুষ যখন একাকী বা ইমামের পেছনে সালাত আদায় করবে, সর্ব ক্ষেত্রেই তাকে ধৈর্যধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোরআন তিলাওয়াত তিনি নিজে করুন বা ইমামের তিলাওয়াত শুনুন, উভয় ক্ষেত্রেই অন্তর তিলাওয়াতের দিকে রাখতে হবে। তাই আমাদের প্রত্যেককে নিজেকে উৎসাহিত করতে হবে এবং নিজে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি নিজ নিজ পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং যাদের সে ভালোবাসে ও যারা তার কথা শোনে তাদেরও এই বিষয়ে উপদেশ দিতে হবে।
♦ লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট