১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন, ঠিক তখনই দিল্লির পার্লামেন্টে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তার ভাষণে বলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহায়তার নিগুঢ় অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে হলে এই একটি বাক্য বোঝাই যথেষ্ট। এই বাক্যটি বুঝতে পারলেই আজকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় লাভের পর ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে বিজেপি সমর্থকদের প্রোফাইলে যখন ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, Revival of Hindutva, Awakening of Hindutva, Awakening of Bharat Mata, A Sacred Land Reclaimed, Bengal is the birthplace of Hindutva, Hindus have reclaimed Bengal after 800 years — জাতীয় প্রচারণার প্রকৃত অর্থ বোঝা যেতে পারে। এটা বুঝতে পারলে বোঝা যাবে, এই ৮০০ বছর কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে এলো?
এই ৮০০ বছর এসেছে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে সর্বশেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনের পতনের মধ্য দিয়ে। বাংলায় প্রথম বাঙালি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাল রাজাদের হাত ধরে (৭৫০-১১৭৪ খ্রিস্টাব্দ)। কিন্তু দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আসা বিজয় সেন কর্তৃক পাল রাজাদের পরাজিত করার মাধ্যমে বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয় (১১৭০-১২০৪)। সেন রাজবংশ ছিল উচ্চবর্ণের এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্ন। তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির কাছে সেন রাজবংশের অন্যতম লক্ষণ সেনের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় হিন্দু সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটে এবং এর পরবর্তীতে আর কখনোই তারা বাংলা দখল নিতে পারেনি। এই শাসনামল টিকে ছিল ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ওই বছর সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইলিয়াস শাহী রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, যা ইতিহাসে বেঙ্গল সালতানাত (১৩৪২-১৫৭৬) হিসেবে খ্যাত হয়েছে। এই সালতানাতের পতন হয় মোগলদের কাছে। শুরু হয় মুঘল শাসনামল (১৫৭৬-১৭১৭)। এরপর আসে নবাবী শাসন (১৭১৭-১৭৫৭)। এই নবাবরা যদিও দিল্লির সালতানাতের অধীনেই ছিলেন। তবুও তারা অনেকটা স্বাধীনভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। পলাশীর আম্র কাননে রবার্ট ক্লাইভের কাছে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় শুরু হয় ব্রিটিশ শাসন আমল (১৭৫৭-১৯৪৭)। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগে পশ্চিমবাংলার বাঙালি হিন্দুরা ভারতের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে থাকাকে বেছে নিলে শুরু হয় বাংলায় কংগ্রেস ও বামদের শাসন। এই দুই দল বা তাদের সমর্থিত জোট বিভিন্ন নির্বাচনে ঘুরেফিরে একের পর এক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব উপভোগ করে। ২০১১ সালে সাবেক কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবাংলায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ২০ মে ২০১১ থেকে ৪ মে ২০২৬ টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করার পর সর্বশেষ নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির কাছে ভূমিধস পরাজয় ঘটে। এর মধ্য দিয়েই ৮০০ বছর পর আবার পশ্চিম বাংলার রাষ্ট্র ক্ষমতায় হিন্দুত্ববাদীরা ফিরে আসে। এটাকেই তারা Revival, Awakening, Reclaim — বাংলায় হিন্দুত্ববাদের পুনরুজ্জীবন, জাগরণ বা পুনরুত্থান বলে গর্বের সাথে দাবি করছে। তাদের মতে, আধুনিককালে সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদের জন্মভূমি এই বাংলা। বলা হচ্ছে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শাক্তদের এক স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া, যা ১৮৬৬ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে শ্রী অরবিন্দ এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী এবং ঋষিদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে তাদের এই দাবি খুব বেশি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিল্প সাহিত্যে যেমন ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি শরৎচন্দ্র বাঙালির জনমনে হিন্দুত্ববাদী চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের পোলিশড ভার্সন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা কমল-দলবিহারিণীর’ সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামল বরণ কোমল মূর্তির’ লক্ষ্যগত কোন পার্থক্য নেই।
‘হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।
দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে,
সঙ্কটদুঃখত্রাতা।
জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
...
ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে,
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়ন অনিমেষে।
দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে,
স্নেহময়ী তুমি মাতা।
জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥’
এটি বঙ্কিমের বন্দে মাতরমের রবীন্দ্র ভার্সন। রবীন্দ্রনাথ ‘এক ধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড-ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে বেঁধে দেয়ার’ যে সংকল্প করেছিলেন, ‘মহাভারত একধর্মরাজ্য হবে’ বলে যে মহাবচন দিয়েছিলেন, বিজেপি বাংলার বিজয়কে সেই মহাবচনের, সংকল্পের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছে। সে কারণেই বিজেপি নির্বাচনে জয়লাভের পর এই মহাকবির জন্মজয়ন্তী ২৫ বৈশাখকে শপথ নেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছিল, যদিও মমতা যথাসময়ে পদত্যাগ না করায় তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। এগুলো কাকতালীয় নয়।
জুন ২০১৪ থেকে জানুয়ারি ২০১৮ এবং এখন ৪ মে, ২০২৬ রাজনৈতিক মানচিত্রে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তার মিত্রদের এই নাটকীয় সম্প্রসারণ আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে রবীন্দ্রনাথের মহাভারত প্রতিষ্ঠার সংকল্পের বাস্তবায়নের চিত্র ফুটে ওঠে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভোট এবং আসন বিচারে ২০১৪ সালে বিজেপি জোট শাসন করত ৩৪% ভূমি এলাকা, ২৫% জনসংখ্যা। এ সময়ে অ-বিজেপি ৬০% ভূমি, ৭০% জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ২০১৮ সালে বিজেপি জোটের দখলে আসে ৭৪% ভূমি, ৬৯% জনসংখ্যা। এসময়ে অ-বিজেপি ২৫% ভূমি, ৩১% জনসংখ্যা। ২০২৬ বঙ্গ বিজয়ের পর বিজেপি জোটের দখলে চলে গেল ৭২% ভূমি এলাকা, ৭৮% জনসংখ্যা। অন্যদিকে অ-বিজেপি জোটের দখলে থাকলো ২২% ভূমি, ২২% জনসংখ্যা। এটি রবীন্দ্রনাথের মহাবচন বাস্তবায়নের ক্রমচিত্র।
তবে বিজেপির এই উত্থান কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। শত বছরের এক পরিকল্পিত পুনরুত্থান। এর পেছনে রয়েছে হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নামক সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পিত নকশা। হিন্দু মহাসভা ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর শিকড় ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বিভিন্ন স্থানীয় হিন্দু আন্দোলনের মধ্যে। মদনমোহন মালব্য, লালা লাজপত রায়, বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন এর বিশিষ্ট নেতা। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের ঐক্য সাধন, ভারতের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা এবং হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভারতের জাতীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ১৯২৫ সালে নাগপুরে ড. কে. বি. হেডগেওয়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম, সবচেয়ে সুসংগঠিত স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থা বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ভারতে হিন্দুত্ববাদের জমিনকে উর্বর করতে এই সংগঠনের সদস্যরা সারা ভারতে লক্ষাধিক শাখা, উপশাখা খুলেছে। বিদ্যাভারতী, আরোগ্য ভারতী, বিজ্ঞানভারতী, এবিভিপি (ছাত্র সংগঠন), সংস্কৃতিভারতী, সেবাভারতী, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল (যুব শাখা), দুর্গা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি (মহিলা শাখা), বিএমএস (ভারতীয় মজদুর সংঘ), বিকেএস (ভারতীয় কিষাণ সংঘ), স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ (অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ), বনবাসী কল্যাণ আশ্রম (উপজাতীয়), হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ (কূটনীতি) প্রভৃতি নামে অসংখ্য সংগঠন তৈরি করেছে। প্রায় শত বছর ধরে এই সংগঠনগুলো বিজেপির সফট পাওয়ার, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট ও আঁতুড়ঘর হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই সুফল আজ ঘরে তুলছে বিজেপি। মনোহর পারিকর, শিবরাজ সিং চৌহান, রাজনাথ সিং, নীতিন গাডকারি, লাল কৃষ্ণ আদভানি, অটল বিহারী বাজপেয়ী, নরেন্দ্র মোদী, মোহন ভগওয়াত, যোগী আদিত্য নাথের মতো নেতারা বিজেপির উল্লিখিত প্রকল্প থেকে উঠে আসা।
অথচ, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিজেপির এই নেতাদের পূর্বসূরি ছিলেন বাংলার রাজনারায়ণ বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ কুমার ঘোষ। রাজা রামমোহন রায় আব্রাহামীয় মতবাদগুলোকে অবৈজ্ঞানিক এবং হিন্দুত্ব সংস্কৃতিতে কর্মের ধারণাকে বৈজ্ঞানিক বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন কট্টর হিন্দু। তিনি ছাত্রদের কখনো হিন্দু দর্শন কখনও পরিত্যাগ না করার পরামর্শ দিতেন। আনন্দমঠের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দুদের সমাজবিজ্ঞানকে ঔপনিবেশিকতামুক্ত করতে এবং ধর্ম ও ধর্মের ভ্রান্ত সমতা থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন। তিনি তাঁর লেখায় জোরালোভাবে ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের এই বন্দেমাতরম গানের সুরারোপ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৯০১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ নামক একটি পত্রিকায় ‘হিন্দুত্ব’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এখানে তিনি হিন্দুত্বকে নিঃস্বার্থতার ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শরৎচন্দ্র বাঙালি মুসলমানদেরকে বাঙালি বলে স্বীকারই করেননি। স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব আধ্যাত্মিকতা এবং হিন্দুদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছিলেন। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন, ‘আমি বলি যে সনাতন ধর্মই আমাদের জন্য জাতীয়তাবাদ। এই হিন্দু রাষ্ট্রের জন্ম সনাতন ধর্মের সাথে, এর সাথেই এটি চলে এবং এর সাথেই এটি বিকশিত হয়। যখন সনাতন ধর্মের পতন হয়, তখন জাতিরও পতন হয় এবং যদি সনাতন ধর্মের বিলুপ্তি ঘটা সম্ভব হতো, তবে সনাতন ধর্মের সাথেই এরও বিলুপ্তি ঘটত।’ গিরিশ চন্দ্র এবং তাঁর নাট্যদল ১৮৭১ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভারতীয় জন সংঘ শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে আজকের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই পশ্চিমবাংলায় বিজেপির জয়ের পর বিজেপি সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করছে, বাংলা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদের জন্মভূমি।
পূর্বেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রের সফট বা পোলিশড ভার্সন। তেমনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, অনুকূল ঠাকুর, হরিচাঁদ ঠাকুর, এমনকি নিমাই চাঁদ ঠাকুরের বৈষ্ণববাদ হিন্দুত্ববাদেরই সফট ভার্সন। এ কারণে জাতপাতে বিভাজিত বাংলার অন্ত্যজ হিন্দুরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা শোষিত হলেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা সব সময় হিন্দুত্ববাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
একইভাবে হিন্দু মহাসভা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস-এর ধারণা এসেছিল বাংলার অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মাধ্যমেই। বাইরে ভারতীয় স্বাধীনতার কথা বললেও ভেতরে ছিল চরম মুসলিম বিদ্বেষ। এ দলের সদস্যরা ছিল শাক্ত পূজারী। মাথার উপর তরবারি রেখে বুক চিরে রক্ত বের করে বেল পাতার উপর রেখে কালী দেবীর সামনে উৎসর্গ করে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে এদের শপথ নিতে হতো। সে কারণে একইভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা কখনোই এসব দলের সদস্যপদ গ্রহণ করেনি। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এ দলেরই সদস্য। স্বাধীনতার নামে তাদের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতার নামে। এদের উৎসাহ যুগিয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার ফুল বাংলার ফল, এক হোক, এক হোক, এক হোক, হে ভগবান।’ অথচ, সেদিন যারা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে বাঙালির হাতে রাখি বেঁধে গাইলো, ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান’— ১৯৪৬-এ এসে সেই বাংলা ভাগ করার জন্য তারা বললো, If India wants her bloodbath, she shall have it. (এম. কে. গান্ধী)। যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে বললেন, মুসলিমরা যদি ভারতবর্ষের বিভাজন চায় তবে ভারতের সকল মুসলিমদের উচিত তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া। তিনিই আবার ১৯৪৭ সালের মে মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠিতে লেখেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। এ কারণেই শরৎ বসু প্রমুখের চেষ্টা বৃথা হয়ে যায়। (চলবে)