চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১,০০২ জন শিশু। ছবি: সংগৃহীত
একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল যে বাংলাদেশ, সে দেশটিই এখন পড়ে গেছে ইতিহাসের ভয়াবহতম পরিস্থিতিতে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ১,০০২ জন শিশু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য বলছে, বিশ্বের মধ্যে এখন হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাবটি চলছে বাংলাদেশে।
সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালীন ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও এখন পর্যন্ত এই দীর্ঘমেয়াদী প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালগুলোতে রোগীদের অতিরিক্ত ভিড়, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং টিকার সরবরাহে তৈরি হয়েছে চরম ঘাটতি। এতে বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি; তারা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে সহজেই সব বয়সীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংক্রামক ভাইরাস।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে হামের উপসর্গ। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম গবেষণাগারে নিশ্চিত হয়েছে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১,০০২ শিশুর, যার মধ্যে ১০০ শিশুর হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
মূলত, বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবেই ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। কোভিড মহামারির সময় সাময়িক ধাক্কা খাওয়া ছাড়া হাম নির্মূলের পথেই ছিল দেশটি।
এরপরও হামের এমন বিধ্বংসী রূপ নেওয়ার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শিতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্বল নজরদারি ও টিকার ক্রয়নীতিতে হঠাৎ করে পরিবর্তন আনায় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এতে অসংখ্য শিশু অতিসংক্রামক এই ব্যাধির বিরুদ্ধে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে।
গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ক্রয়নীতি বদলানোর কারণেই বাজারে টিকার চরম সংকট তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২৪ সালে টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিল করার মাশুল গুনতে হচ্ছে শিশুদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও টিকাদানের এই ঘাটতিকে প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
জরুরি ভিত্তিতে শুরু হওয়া হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, টিকা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে। এরপরও এখন পর্যন্ত লাগাম টানা যায়নি হামের প্রাদুর্ভাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও অনেক শিশু টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি; তাদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন জরুরি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমার জানা মতে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত শিশু মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এক বছরে এত রোগী দেখার অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই। এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আর দুঃখজনক হলো, এর বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে অবিলম্বে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা, টিকাদান বৃদ্ধি এবং জোরদার জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে, এমন এক সময়ে হামের রোগীর সংখ্যা আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে, যখন ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গু রোগীর চাপে আগে থেকেই ভুগছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। হামের রোগী সামলাতে হিমশিম খাওয়ার এটিও একটি বড় কারণ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরে ইতোমধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার একদিনেই ডেঙ্গুতে ৯ জনের প্রাণহানি এবং ১ হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী ভর্তির রেকর্ড তৈরি হয়েছে; যা এ বছরের সর্বোচ্চ। বুধবারও ৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ডেঙ্গু। আর নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৬৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীদের চাপ এতটাই বেশি যে সবাইকে শয্যা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাম রোগীদের জন্য আমাদের ৬০টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও অনেক শিশুকে মেঝেতেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুদের পানিশূন্যতা দূর করার অপরিহার্য পেডিয়াট্রিক স্যালাইনের মারাত্মক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ১ হাজার ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২ হাজার ৩৫০ জনেরও বেশি রোগী।
সাধারণ পরিবারগুলোর কাছে হামের প্রাদুর্ভাব রূপ নিয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনিশ্চয়তা, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি আর চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিম্নবিত্তদের কোমর ভেঙে ফেলছে।
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের ফলে ডেঙ্গুর বিস্তার, অন্যদিকে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের এমন রূপ; দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বিক সক্ষমতাকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আরটিভি/এসএইচএম
আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন