রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার এসব পরিবর্তনকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করব্যবস্থা গঠনের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন বিধানগুলোর বড় একটি অংশ ব্যক্তি করদাতা, মধ্যবিত্ত পরিবার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সাথে কর প্রশাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নজরদারি এবং নতুন নতুন সম্পদকে করের আওতায় আনার ফলে দেশের করব্যবস্থায় একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো সোনা, রুপা, হীরা, মূল্যবান ধাতু এবং ডিজিটাল সম্পদ বিক্রি করে অর্জিত মূলধনী মুনাফাকে করের আওতায় আনা। নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো সম্পদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করার পর বিক্রি হলেও অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এতদিন দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার নীতিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্পদের ওপরও কর আরোপের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি মূলধন বাজার, স্বর্ণে বিনিয়োগ এবং বিকল্প সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয়ের প্রবণতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রেও নতুন অর্থ আইন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যক্তিগত ঋণ এখন থেকে অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে কোনো ঋণ টানা ছয় বছর পরিশোধ না হলে সেটিকে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে গণ্য করে আয়কর আরোপ করা হবে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেয়া-নেয়া একটি প্রচলিত বিষয়। নতুন বিধান কার্যকর হলে এসব পারিবারিক লেনদেনও কর-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে পারে। বাস্তব জীবনের পারিবারিক সহায়তা এবং করযোগ্য আয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ কর প্রশাসনের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হলেও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর টার্নওভার কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে টার্নওভার কর করা হয়েছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ, আগে যেখানে ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। অন্য দিকে নিবন্ধিত স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য কর অবকাশ এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লোকসান সমন্বয়ের সুযোগ দেয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতেই এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সুবিধা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কিংবা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এর সুফল পাবে না। বরং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি টার্নওভার কর তাদের প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দেবে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে। উৎসে কর ব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও আনা হয়েছে। ডিম, মুরগি, সবজি, চালসহ কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর কমানো হয়েছে। পাশাপাশি কম্পিউটার প্রিন্টার ও মেমোরি ডিভাইস আমদানির ক্ষেত্রেও কর হ্রাস করা হয়েছে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং কিছু ভোক্তা পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কর ফাঁকি প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়া হলেও ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সাথে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নতুন অর্থ আইনে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণ লেনদেন, সুদ নির্ধারণ এবং বকেয়া সুদ সংক্রান্ত বিধানও আরো কঠোর করা হয়েছে। টানা তিন বছর অনাদায়ী থাকা সুদকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো নির্ধারিত পরিমাণ লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ হলে ঘাটতির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কর ফাঁকি কমানো এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব বিধানের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে আর্থিক সঙ্কটে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মাসিক রিটার্নের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেয়া হলেও প্রতিটি কর মেয়াদের শুরুতেই আগের মেয়াদের প্রদেয় ভ্যাটের এক-তৃতীয়াংশ অগ্রিম জমা দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মতে, এতে তাদের কার্যকর মূলধনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। একই সাথে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ এবং গাড়ি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করায় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতাও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কর আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা সহজ করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত।

সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থায়ও নতুন কয়েকটি পণ্য যুক্ত হয়েছে। ক্যাটফিশ ফিলে, প্রাকৃতিক মধু, পোষা প্রাণীর খাদ্য, ওয়াশিং মেশিন এবং উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর নতুন সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলাসপণ্য ও আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে। এর প্রভাব বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে। কর আপিল ব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক সংস্কারও এসেছে। আপিলের আগে কর জমার হার কমানো হয়েছে এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত আপিল ফি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। এতে প্রকৃত করদাতাদের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কর ফাঁকি, সফটওয়্যার টেম্পারিং কিংবা ভ্যাট জালিয়াতির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রেখে কর প্রশাসনের কঠোর অবস্থান আরো স্পষ্ট করা হয়েছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর শাস্তির পাশাপাশি করদাতাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশবান্ধব কর কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে মোটরযানের কর ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য কিছু কর সুবিধা বহাল রাখা হলেও বড় ইঞ্জিনক্ষমতা ও উচ্চমূল্যের গাড়ির ওপর সম্পূরক শুল্ক এবং মোট করের বোঝা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে একদিকে বিলাসবহুল গাড়ির বাজারে প্রভাব পড়তে পারে, অন্য দিকে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর নীতিগত বার্তা দেয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত না হলে শুধু করনীতি দিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেয়া সম্ভব হবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে করনীতি এমন হওয়া উচিত, যাতে প্রকৃত আয় না বাড়লেও সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত করের চাপ বহন করতে না হয়। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমিত আয় বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। এর মধ্যে কর রেয়াত কমানো, নতুন কর আরোপ এবং প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি তাদের আর্থিক পরিকল্পনাকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews