দেশের স্বাস্থ্য খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে অনিয়ম, রোগীবান্ধব সেবার ঘাটতি এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবসহ নানা বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও জনসেবাকে আরো কার্যকর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, জটিল রোগের ভ্যাকসিনের ব্যবস্থাপনা, হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো সম্প্রসারণ, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, রোগীদের জন্য উন্নত খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ এবং অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো মানসম্মত চিকিৎসাসেবা। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে সেবার মান উন্নয়ন হয়নি। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নরসিংদী জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল নরসিংদী-৪ মনোহরদী- বেলাবো থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরে তিনি নিজ জেলায় সরকারি মেডিকেল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
নরসিংদী জেলায় সরকারি মেডিকেল কলেজ নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। রোববার (১৪ জুন) স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়।
জানা যায়, হাসপাতালগুলোর সেবার মান পর্যবেক্ষণে নিয়মিত মূল্যায়ন কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন, চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং রোগীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এর ফলে হাসপাতালগুলোতে জবাবদিহিতা বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেট, দালালচক্র এবং অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, হৃদরোগ, ক্যানসার এবং কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলাদা ইউনিট সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত চিকিৎসা, চাহিদামতো ওষুধ এবং ওষুধের পাশাপাশি রোগীর দ্রুত সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা চিকিৎসার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিক ও কার্যকর করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ এলাকা নরসিংদীর মনোহরদীতে দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তির মধ্যে অর্থসহায়তা দেয়ার সময় বলেছেন, ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে। আল্লাহর রহমতে আর আপনাদের দোয়ায় টাকার প্রতি কোনো লোভ হয়নি। আমাকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনি যা করবেন, পূর্ণ সমর্থন দেব। আমি লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জামায়াতের লোকেরা বলে, এটা নাকি বে-ইনসাফ হইছে। কয়েকটা টাকা না কম নিয়া তারা (আদ্-দ্বীন হাসপাতাল) মানুষরে বোকা বানায়। ছয়টা বাচ্চাকে মেরে ফেলছে, ওরা (জামায়াত) এখন তাদের (আদ্-দ্বীন হাসপাতাল) পক্ষে নানান কথা বলে। কথা বলুক আর যাই করুক, বাতিল করছি তো করছিই। একটা পানিশমেন্টে সারা দেশের প্রাইভেট হাসপাতালগুলো ঠিক হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা একটি ব্যতিক্রমী সরকার চালাচ্ছি। দলমত-নির্বিশেষে আমরা সব মানুষের সেবা করতে চাই। এখন সরকারি সুবিধা পেতে আর কাউকে ঘুষ দিতে হয় না। প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, সবাইকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পাইলটিং স্কিমের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া হবে। যেখানে প্রতিটা ঘরে ঘরে আমাদের লোক যাবে। তারা গিয়ে প্রাথমিক সেবা দেওয়ার পর যদি মনে করে হাসপাতালে নিতে হবে, তবেই একজন রোগীকে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। এভাবে দেশব্যাপী সবার চিকিৎসাব্যবস্থাকে সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আমরা চীনের সহযোগিতায় ৩ হাজার বেডের দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে যাচ্ছি। যেখানে শিশু ও নারীদের চিকিৎসাসেবার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে।
রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নারায়ণগঞ্জে বলেছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চিন্তা করছেন। মানুষের ঘরে ঘরে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই হবে নারী। ঘরে ঘরে মেশিন নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। সারা বাংলাদেশে ১৫০০ বেড করে দুইটি স্পেশালাইজড হাসপাতাল হবে শুধু মেয়েদের জন্য। এই দুইটি হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস, মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার ও ইউরিনারি ক্যান্সার, পঙ্গুত্বের ইউনিট ও ডেলিভারি ইউনিট থাকবে। আবার সারা দেশে ১০০০ হাজার বেডের ২০টি হাসপাতাল হবে। যেখানে ৫টি করে অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হবে এবং ৪টি হেলিকপটার থাকবে যাতে করে সারা বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি রোগীদেরকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে।
আমাদের ক্ষমতা নেয়ার পর হাম আক্রমণ করে। বিগত স্বৈরাচার সরকার এবং অদক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের টিকা কার্যক্রম পর্যাপ্ত স্টক রেখে যায়নি। ভিটামিন ট্যাবলেট জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন ছিল না। আমরা একটি বিপর্যস্ত রাজনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণ করি। কিন্তু আমাদের একটাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের পথপ্রদর্শক। উনার সুদক্ষ নেতৃত্বে আমরা ভয়ের পরিবর্তে সাহস নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। তার নেতৃত্বে আমরা পর্যন্ত পরিমাণে হামের ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে আমাদের নেতা তারেক রহমান দিকনির্দেশনা দিয়েছেন শুধু টাকা না; কীভাবে দেশটাকে উন্নত করা যাবে। কোথায় কোথায় উন্নতির আভাস দিতে হবে জাতিকে? সঙ্গে অর্থনীতির সাপোর্ট দিয়েছেন। স্বাস্থ্যখাতে আমাদের ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।