নবনিযুক্ত ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মুহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ঘিরে সারা দেশে হানাফি মাজহাবের অনুসারী আলেম-ওলামা ও মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। হানাফি মাজহাব, দেওবন্দি আলেম সমাজ, ঐতিহ্যবাহী পীর-মাশায়েখ ও তাবলিগ জামাত সম্পর্কে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া এবং সালাফি/লা-মাজহাবি আকিদা প্রচারের অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণের দাবি জানিয়েছেন দেশের বহু উলামায়ে কেরাম। তবে আলেমদের এই যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ ও অপসারণের দাবির মুখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নজিরবিহীন ও সংঘবদ্ধ অনলাইন তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় আকিদাগত দিক থেকে সালাফি বা লা-মাজহাবি পরিচয় দেওয়া শামীম কায়সার লিংকন একজন মূলত জেনারেল লাইনে শিক্ষিত মানুষ। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ায় দ্বীনি অঙ্গনে তাঁর কোনো নিজস্ব ধর্মীয় ভক্ত বা অনুসারী থাকার কথা নয়। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আলেমদের সমালোচনা ও তাঁকে পদচ্যুত করার দাবি উঠলেই সেখানে একজোটে ও পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে জামায়াতে ইসলামীর ‘অনলাইন টিম’ বা ‘বট বাহিনী’।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শামীম কায়সার লিংকন আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং তিনি ব্যবসায় প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। কোনো প্রথাগত ইসলামি মাদরাসার সনদ বা ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই। তবে বিতর্কিত আকিদাগত অবস্থানের কারণে তিনি যখন হানাফি মাজহাবের অনুসারী আলেমদের তোপের মুখে পড়েছেন তখন তার পাশে সর্বোচ্চ দিয়ে নেমে পড়েছে এক শ্রেণির বট বাহিনী। সামাজিক মাধ্যমে আলেমদের যৌক্তিক দাবির বিপক্ষে ও লিংকনের পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো এই অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন ।
নেটিজেন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ফেসবুকে আলেম-ওলামাদের পেজ বা বিভিন্ন সংবাদপত্রের কমেন্ট বক্সে লিংকনের বিরুদ্ধে কথা বললেই জামায়াত সমর্থিত আইডিগুলো থেকে সংঘবদ্ধ আক্রমণ ও গালিগালাজ করা হচ্ছে। তাদের বট বাহিনী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা সালাফিদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে ক্রমাগত লিংকনের সমর্থনে পোস্ট ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে তাঁর পদ রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বট বাহিনীর এই বিতর্কিত ভূমিকায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও কওমি ধারার শীর্ষ আলেমরা। তাঁরা বলছেন, ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের মওদুদী রাজনৈতিক দর্শনে পরিচালিত করলেও এবার তারা প্রকাশ্যে হানাফি আকিদা ও ঐতিহ্যবাহী আলেমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আলেমদের মতে, দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ও ইসলামি সংগঠন হানাফি মাজহাব ও সুফিবাদী/দেওবন্দি ধারা অনুসরণ করে। অথচ জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থে ও মূলধারার আলেম সমাজকে কোণঠাসা করতে প্রকাশ্যে লা-মাজহাবি ও সালাফিদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতের এই ‘দ্বিমুখী’ ও ‘সুবিধাবাদী’ নীতির কারণে আলেমদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াতের এই সংঘবদ্ধ বট বাহিনীর অনৈতিক তৎপরতা নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। আলেম সমাজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানুষের আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো সুযোগ নেই। জেনারেল শিক্ষিত একজন বিতর্কিত লা-মাজহাবি ব্যক্তিকে জোর করে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় টিকিয়ে রাখতে জামায়াতের এই অনলাইন আক্রমণ দেশীয় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আলেম সমাজের ঐক্যে ফাটল ধরাচ্ছে। আলেমদের সাফ কথা—অবিলম্বে এই সংঘবদ্ধ অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফি মুসলিমদের অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রীকে অপসারণ করতে হবে।