বয়স হয়েছে, সম্পর্কও আছে তবু বিয়ের কথা উঠলেই কেন যেন মনটা পিছিয়ে যায়! কেউ ভাবেন, ‘বিয়ের পর জীবনটা কি আগের মতো থাকবে?’ কেউ আবার ভাবেন, ‘ভুল মানুষকে বিয়ে করে ফেললে?’ আবার কারও কাছে বিয়ে মানেই যেন স্বাধীনতা হারানোর ভয়।
বিয়ে জীবনের বড় একটি পরিবর্তন। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা দ্বিধা বা দুশ্চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। তবে ভয় যদি এতটাই বেড়ে যায় যে বিয়ের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলতে ইচ্ছা করে, সম্পর্ক ভালো থাকা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতি এর কথা উঠলেই পিছিয়ে যেতে হয় তাহলে এর পেছনে মানসিক কারণ থাকতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে বিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার প্রতি তীব্র ভয়কে সাধারণভাবে ‘গ্যামোফোবিয়া’বলা হয়। তবে এটি আলাদা কোনো মানসিক রোগের আনুষ্ঠানিক নাম নয়, উপসর্গের ধরন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা এটিকে উদ্বেগ বা ফোবিয়ার মতো সমস্যার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে পারেন।
এর পেছনে সবার ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না। কারও ভয় তৈরি হয় অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে, আবার কারও ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বড় ভূমিকা রাখে।
বিয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভবিষ্যতের অনেকটা সময় জড়িয়ে থাকে। তাই ‘মানুষটিকে কি সত্যিই আমি চিনি?’ কিংবা ‘বিয়ের পর যদি সে বদলে যায়?’ এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক। কিন্তু এসব চিন্তা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন বিয়ের প্রতি ভয় তৈরি হতে পারে।
অনেকের কাছে বিয়ে মানেই নিজের ব্যক্তিগত সময়, বন্ধু, ক্যারিয়ার কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কমে যাওয়া। ফলে বিয়েকে তারা আনন্দের পরিবর্তে একটি বড় বাঁধন হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।
শৈশবে বাবা-মায়ের দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক অশান্তি দেখলে বিয়ে সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। অবচেতন মনে তখন এমন বিশ্বাস জন্মাতে পারে ‘বিয়ে করলে শেষ পর্যন্ত কষ্টই পেতে হয়।’
প্রতারণা, প্রত্যাখ্যান বা বিশ্বাসভঙ্গের মতো অভিজ্ঞতা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন সম্পর্কটি ভালো হলেও পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি ভয় সহজে দূর নাও হতে পারে।
বিয়ে মানে শুধু ভালোবাসা নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও মানসিক দায়িত্বও যুক্ত। এসব দায়িত্ব সামলাতে পারব কি না এই চিন্তা থেকেও বিয়ের ভয় তৈরি হতে পারে।
বিয়ের কথা উঠলে শুধু মন খারাপ বা দ্বিধা নয়, কারও কারও শারীরিক অস্বস্তিও হতে পারে। যেমন—বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, হাত-পা কাঁপা, ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা কিংবা আতঙ্কের মতো অনুভূতি।
তবে এসব উপসর্গ থাকলেই যে গ্যামোফোবিয়া হয়েছে, এমনটা বলা যায় না। নির্ণয়ের জন্য ব্যক্তির পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিয়ের আগে ‘আমি কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি?’ এমন চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। নতুন জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। পার্থক্যটা তৈরি হয় ভয়ের মাত্রায়।
যদি ভয় সাময়িক হয় এবং আলোচনা, সময় ও বাস্তবতা বিবেচনার মাধ্যমে কমে আসে, সেটি সাধারণ দুশ্চিন্তা হতে পারে। কিন্তু ভয় যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, বিয়ের প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলতে বাধ্য করে, বারবার সম্পর্ক নষ্ট করে দেয় কিংবা দৈনন্দিন জীবনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বিয়ের ভয় মানেই কি বিয়েতে অযোগ্যতা? একেবারেই নয়।
অনেক সময় বিয়ের ভয় আসলে বিয়েকে নিয়ে নয় বরং ভুল মানুষকে বেছে নেওয়া, বিশ্বাস হারানো, স্বাধীনতা হারানো কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার ভয়।
তাই বিয়ের কথা উঠলেই ভয় লাগছে বলে নিজেকে কোনো রোগের রোগী ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের কাছে প্রশ্ন করা জরুরি ‘আমি আসলে কোন বিষয়টিকে ভয় পাচ্ছি?’
ভয় যদি খুব তীব্র হয় বা দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
কারণ বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু ‘বিয়ে করব কি না’ নয়, ‘কেন ভয় পাচ্ছি’ এই প্রশ্নের উত্তরটাও জানা জরুরি।