জন্মের পর দুই হাতহীন নবজাতককে দেখে অনেকেই বলেছিলেন—এই সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখে কী হবে? কেউ কেউ এমনকি মেরে ফেলার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু মা সাজেদা বেগম সেই ভয়াবহ পরামর্শ উপেক্ষা করে মেয়েকে বুকে আগলে রাখেন। সেই মেয়েই আজ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া গ্রামের আয়েশা আক্তার, যিনি পা দিয়েই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করে হয়েছেন সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত প্রতীক।
জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও আয়েশা জীবনের কাছে কখনো হার মানেননি। গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করা এই তরুণী ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখালেখি শিখেছেন। অন্য শিশুরা যখন হাতে কলম ধরে, তখন তিনি পায়ের আঙুলে কলম ধরে খাতা ভরেছেন অক্ষরে অক্ষরে।
আয়েশা মরহুম আব্দুল লতিফ ও সাজেদা বেগমের মেয়ে। বাবাকে হারিয়েছেন প্রায় দেড় বছর আগে। চার বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
সরেজমিনে সাঘাটার কচুয়া গ্রামে দেখা গেছে, দুই হাত না থাকলেও আয়েশা নিজের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই পা দিয়ে করেন। কখনো পায়ের আঙুলে চাল ঝাড়ছেন, কখনো তরকারি কাটছেন, আবার কখনো পা দিয়েই খাতায় লিখছেন। সংসারের ছোট-বড় সব কাজেই তিনি স্বাভাবিক দক্ষতার সাথে অংশ নেন।
এ সময় কথা হয় আয়েশার মা সাজেদা বেগমের সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, জন্মের পর অনেক মানুষ অনেক কথা বলেছে। কেউ বলেছে, এই মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কিন্তু, আমি কখনো আমার মেয়েকে অভিশাপ মনে করিনি। আল্লাহ যেভাবে দিয়েছেন, সেভাবেই মানুষ করার চেষ্টা করেছি। আজ সে পা দিয়ে লেখাপড়া করে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আয়েশার চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও কখনো হাল ছাড়েনি। আমরা চাই তার একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ দিত, তাহলে সে সম্মানের সাথে নিজের জীবন চালাতে পারত।
প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, অনেকেই আসে, ভিডিও করে নিয়ে যায়, ছবি তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে মেয়েটার জন্য তেমন কেউ কিছু করে না। অথচ আয়েশা পা দিয়েই সংসারের সব কাজ করে রান্না, তরকারি কাটা, ঘর ঝাড়ু দেয়া, বিছানা গোছানোসহ সব কাজই সে নিজেই সামলায়।
কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা আক্তার বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। আমি ভিক্ষা চাই না, আমি আমার যোগ্যতায় একটা চাকরি চাই। সরকার যদি আমার মতো অসহায় শিক্ষিত মানুষের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের পাশে থাকতে পারতাম।
তিনি আরো বলেন, মানুষ দান-সদকা করে, সাহায্য করে। কিন্তু আমার মতো একজন শিক্ষিত মানুষের জন্য যদি একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়তা হতো।
সাঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আজহার আলী জানান, আয়েশার জীবন কেবল একজন প্রতিবন্ধী নারীর গল্প নয়, এটি ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য ও অদম্য সাহসের এক অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত।
তারা মনে করেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতা পেলে তিনি শুধু নিজের জীবনই বদলাতে পারবেন না, বরং অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবেন। যে শিশুর বেঁচে থাকা নিয়েই একদিন প্রশ্ন তুলেছিল সমাজের কিছু মানুষ, আজ সেই আয়েশা প্রমাণ করেছেন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মনোবল, সাহস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
এ সব বিষয় কথা হলে সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, আয়েশার বিষয়টি সত্যিই মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তার মতো একজন মেধাবী ও সংগ্রামী মেয়ের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রাখব এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করব।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর নয়া দিগন্তকে জানান, আয়েশা আক্তারের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে, আমরা ঈদের সময় তার সাথে সাক্ষাৎও করেছি। সরকারি পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে তাকে কিছু সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আয়েশা অত্যন্ত মেধাবী ও সংগ্রামী একজন মানুষ। তার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের সাথে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।