একটির পর একটি গুগলি বের হলো ইমরান তাহিরের হাত ঘুরে। ব্যাটসম্যান কখনও ভুল লাইনে খেললেন, কখনও চেষ্টা করেও পারলেন না ব্যাটে-বলে করতে, কখনও বোল্ড হলেন ছেড়ে দিয়ে। তাহির ছুটলেন মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চিরচেনা উদযাপনে। ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেলেন তিনি ইতিহাসের ঠিকানায়, যেখানে পা পড়েনি আগে কারও। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছুটে চলা তাহির গড়লেন অনন্য এক কীর্তি। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে সেন্ট লুসিয়া কিংসের বিপক্ষে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সের অধিনায়ক ৫ উইকেট শিকার করলেন ১৭ রানে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে ৪৭ বছর বয়সে ৫ উইকেট শিকারের প্রথম নজির এটি। ৪৭ বছর ১৬৬ দিন বয়সে এই কীর্তি গড়লেন তাহির। পেছনে ফেলে দিলেন তিনি তোমাকানুতে রিতাওয়ার রেকর্ড। ২০২২ সালে ফিজির বিপক্ষে ১৯ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন কুক আইল্যান্ডের এই অফ স্পিনার। সেদিন তার বয়স ছিল ৪৬ বছর ২৯৯ দিন।
বয়স যে কেবলই একটি সংখ্যা, সেই প্রমাণ বারবারই দিয়ে চলেছেন তাহির। এই রেকর্ডের তালিকায় তাকালেই তা ফুটে ওঠে স্পষ্ট হয়ে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বয়সে ৫ উইকেট শিকারের তালিকায় শীর্ষ ছয় কীর্তির চারটিই তাহিরের! গত সিপিএলেই গায়ানার হয়ে অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডা ফ্যালকন্সের বিপক্ষে ৫ উইকেট শিকারের ম্যাচে তার বয়স ছিল ৪৬ বছর ১৪৮ দিন। ২০২৪ বিপিএলে রংপুর রাইডার্সের হয়ে চট্টগ্রামে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন ৪৪ বছর ৩২৩ দিন বয়সে। এই রেকর্ডের পাঁচে আছেন প্রকাশ মিশ্র। বুলগেরিয়ার মিডিয়াম পেসার ২০২৩ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৫ উইকেট নেন ৪৪ বছর ১৬৫ দিন বয়সে। তালিকায় পরের নামটি আবার তাহিরের। ২০২১ সালের দ্য হান্ড্রেডে বার্মিংহাম ফিনিক্সের হয়ে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি ৪২ বছর ১৩৫ দিন বয়সে। এছাড়া ৩৯ বছর ১৯৬ দিন ও ৩৭ বছর ৩২৭ দিন বয়সেও ৫ উইকেট শিকারের নজির গড়েছেন তাহির, এই দুটিই দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট নিলেন তিনি ৬ বার। স্পিনারদের মধ্যে তিনিই এখন এককভাবে শীর্ষে এখানে। পেছনে ফেলে দিলেন ৫ বার করে ৫ উইকেট শিকারি সুনিল নারাইন ও সাকিব আল হাসান, শাহিন শাহ আফ্রিদি, লাসিথ মালিঙ্গা, ভুবনেশ্বর কুমার, রশিদ খানদের।
পেস-স্পিন মিলিয়ে তাহিরের চেয়ে বেশিবার ৫ উইকেট শিকার করেছেন কেবল ডেভিড ভিসা। দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত নামিবিয়ান পেসার ৭ বার পেয়েছেন ৫ উইকেটের স্বাদ। ৪১ বছর বয়সী ক্রিকেটার এখনও খেলে যাচ্ছেন বেশ দাপটেই। চলতি ইউরোপিয়ান প্রিমিয়ার লিগে ৬ ম্যাচে শিকার করেছেন ১৩ উইকেট। তবে তাহিরের কীর্তি অবিশ্বাস্য আরেকটি দিক থেকে। ৬ বার ৫ উইকেটের সবকটি নিয়েছেন তিনি বয়স ৩৭ পেরিয়ে!
আরও একটা তালিকায় তাহির নিজের নামটা ওপরের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। সব ধরনের টি-টোয়েন্টিতে তাহিরের উইকেট এখন ৫৮৯টি। টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি উইকেট পাওয়া বোলারের তালিকায় তাহিরের অবস্থান চতুর্থ। তার চেয়ে বেশি উইকেট আছে রশিদ খান (৭৩৬), সুনীল নারাইন (৬৫৭) ও ডোয়াইন ব্রাভোর (৬৩১)। ৫৮৯ উইকেটের মধ্যে সিপিএলেই সর্বোচ্চ উইকেট তাহিরের, ১৪২টি। এই মৌসুমে উইকেট নিয়েছেন ১২টি। ৪৭ বছর বয়সে গায়ানাকে দিচ্ছেন নেতৃত্বও। অথচ এই তাহির সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলেছেন সাত বছরের বেশি আগে। টেস্ট খেলেছেন ২০টি, ১০৭টি ওয়ানডে, ৩৮টি টি-টোয়েন্টি। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে তার খেলা সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি ছিল ওয়ানডে।
এই বয়সেও নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাহিরের ছেলে। ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে খেলবেন- এই স্বপ্ন থেকেই এত পরিশ্রম করে এই বয়সেও খেলে যাওয়া। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পরিশ্রমটা বোধ হয় তাহিরকেই আরও কিছুদিন করে যেতে হবে। কারণ, তার ছেলে জিবরান তাহিরের বয়স মাত্র ১২! এর একটা অন্য মানেও আছে। তাহির হয়তো সামনেও বল হাতে রেকর্ড গড়বেন। আপাতত এই রেকর্ডেই সন্তুষ্ট থাকা যাক।
ম্যাচে বাংলাদেশের জন্যও আছে সুখবর। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে অভিষেকেই নিজের জাত চিনিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। বল হাতে মাত্র ১৩ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট, আর তার দুর্দান্ত বোলিংয়েই সেন্ট লুসিয়া কিংসকে মাত্র ১১৯ রানে গুটিয়ে দিয়েছে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্স। শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮.৩ ওভারে লক্ষ্য পেরিয়ে চার উইকেটের জয় পেয়েছে গায়ানা। ম্যাচসেরা হয়ে তাহির অবশ্য প্রসংশা করেছেন মিরাজের। বলেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে নবী ছিল, যে একজন খুবই মানসম্পন্ন বোলার এবং আমাদের সেরা বোলার। মিরাজ এসে ঠিক আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ীই দারুণ বোলিং করেছে। তাকে দলে পেয়ে আমরা সত্যিই খুব খুশি। মিরাজ একজন বিশ্বমানের বোলার, যে সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত পারফর্ম করে আসছে।’
এই জয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান আরও মজবুত করেছে গায়ানা। ৮ ম্যাচে ৭ জয়ে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা এখন টেবিলের চূড়ায়। ১০ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে অ্যান্টিগা অ্যান্ড বারবুডা ফ্যালকন্স।