ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র ৬ মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক এক কঠিন ভূরাজনৈতিক দাবাখেলার চাপে পড়েছে। বিগত দিনের প্রথা ভেঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতের প্রত্যাশা ও আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে মালয়েশিয়া ও চীন সফর ছিল নতুন বাংলাদেশের বার্তাবাহী সংকেত। চীন সফরে গিয়ে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি মাইলফলক সমঝোতা ও চুক্তি সেই বার্তাকে বিশ্বের সামনে স্পষ্ট করেছে। বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় পররাষ্ট্রনীতিতে কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতকে পাশ কাটিয়ে আমেরিকার সাথে সরাসরি সম্পর্কোন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দরকষাকষি ট্যারিফ প্রেসার সামলাতে যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা হয়েছিল, তাতে অর্šÍবর্র্তী সমালোচনায় পতিত ফ্যাসিস্টের দোসরদের বেশ উচ্চকণ্ঠ শোনা গেছে। অবশ্য আমাদের দেশে এখন এমন একটি ধারণা সাধারণ্যে বদ্ধমূল হচ্ছে যে, ভারতের শাসকশ্রেণী এবং বাংলাদেশের আওয়ামী ঘরানার ব্যক্তিরা যা কিছুর বিরোধিতা ও সমালোচনায় মুখর হবে, তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। যাই হোক, চীন সফরের পর অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের টানপড়েনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সেটা খুব অমূলক নয়, অনিবার্যও নয়। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত, দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের তিনদিনের ঢাকা সফরকে ঘিরে সেই পুরনো সমালোচকরা কিছুটা উৎফুল্ল ও পুলকিত বোধ করলেও করতে পারেন। তবে ডিনার না করে সার্জিও গোরের ঢাকা ত্যাগের ঘটনা বাদ দিলে এই সফরের কর্মসূচি ও পরবর্তী আউটপুট বাহ্যিকভাবে বাংলাদেশের পক্ষেই বলা যায়। বিগত সরকারের আমলে জারি করা বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতার মাত্রা হ্রাস করা, ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আগমন বার্তা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ক পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের আলোচনার মধ্য দিয়েই তা প্রমানিত হয়েছে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদি এবং সার্জিও গোরের বৈঠক, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের ঢাকা সফরের আয়োজন ও বড় বিনিয়োগের প্রত্যাশা থেকে এটা মনে হতে পারে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঢাকাকে চীনের করতলে ছেড়ে না দিতে এখানে বড় বিনিয়োগ এবং দিল্লির খবরদারি বন্ধে সবুজ সংকেত দিয়েছেন। সার্জিও গোরের ঢাকা ত্যাগের পরের দিনই দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনীতির উপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার বার্তা প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি প্রত্যার্পণ আইনের আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয় নিয়েও দিল্লির শাসকরা চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা যায়। দুই বছর আগে অর্ন্তবর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে রাজনীতি করতে না দেয়া এবং তাকেসহ ভারতে পলাতক মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে যে চিঠি দিয়েছিল, এতদিন পর সে বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে। সেখানকার সংসদে এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে । ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত কাম-রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদি বাংলাদেশে পা রেখেই ভারত-বাংলাদেশ আকাশ-বাতাস একীভূত করে ফেলার যে রেটরিক শুনিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশ সর্বোতভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি ইতিমধ্যে অনেকটা ধাতস্থ হয়ে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের উপর্যুপরি আমন্ত্রণ জানিয়ে যাচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে বাগে রাখতে ভারত এখন বন্ধুত্বের কৌটিল্যের রাজনৈতিক ভণিতার আশ্রয় নিতে চাইছে। একই সঙ্গে হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার করে তারেক রহমানকে চাপে রাখার পুরনো কৌশলও অব্যাহত রেখেছে ভারত।


জুলাই অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ও নিরঙ্কুশভাবে বাংলাদেশ ভারতীয় আধিপত্যবাদের করতলগত ছিল। এখানকার রাজিনীতি ও ক্ষমতার মসনদের উপর সরাসরি প্রভাব ও হস্তক্ষেপ বন্ধুত্বের পরিসীমা ডিঙ্গিয়ে একটি সর্বাত্মক হেজিমনিক এজেন্ডায় পরিনত হয়েছিল। ক্লেপটোক্রেটিক অলিগার্ক ও জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা ভারতের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সাথে ভারতের এই গোপণ সমঝোতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শুরু হলেও এর নবপর্যায়ের নবযাত্রার সূচনা হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেন বিশেষ সরকারের সময়ে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজির আওতায় ভারতের সাথে ওয়াশিংটনের কৌশলগতম মৈত্রীর প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী নীতির আওতায় দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সমঝোতায় ঢাকায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যহত করে একটি সেনাসমর্থিত সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে সেই সরকারের মাধ্যমে নবম জাতীয় নির্বাচনে বিশেষ ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। এরপর ভারত যেন বাংলাদেশকে পেয়ে বসেছিল। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে পরপর চারটি নির্বাচন একইভাবে বিরোধিদলকে বৃত্তের বাইরে রেখে পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অচল ও অকার্যকর করে তোলা হয়েছিল। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চতুর্থ দফা ক্ষমতারোহনের ৭ মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত জানবাজ প্রতিরোধে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য না হলে তাদের ঘোষিত নীতি ছিল ২০৪১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন-শোষণ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। পাশেই চীনের দোর্দন্ড প্রতাপের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা ভারতের হাতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জিম্মিদশা মুখ বুজে সহ্য করার বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। অথার্ৎ বাংলাদেশের সুশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যমুক্তির বিষয়গুলো আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক গ্যারাকলে অনেকটাই উৎসর্গিত হয়েছিল। অখন্ড ভারত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কোয়াটের কৌশলগত সমঝোতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কম্প্রোমাইজড এবং বাফার টেরিটরিতে পরিনত দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে সব আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক শক্তি এক দশক ধরে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বসম্প্রদায়ের অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক রাজৗনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পশ্চিমাদের চাপ যে ছিল না তা নয়। কর্তৃত্ববাদী শাসনে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান খুবই নড়বড়ে ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ভারতের আধিপত্যের কাছে আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ও সমঝোতার সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির প্রথম ঘটনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, দ্বিতীয় ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আওয়ামী লীগের এবারের পতন শুধু আওয়ামী লীগের পতন নয়, এটি মূলত বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের পতন। এই পতনের ধাক্কা কিছুতেই যেন সামলে উঠতে পারছে না ভারত। শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের পর থেকেই ভারত তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নাটক, রাজনৈতিক পুনর্বাসনসহ বাংলাদেশকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের হয়তো প্রত্যাশা ছিল, যে করেই হোক তারেক রহমানকে তারা ম্যানেজ করতে করতে পারবে। সে সব অলীক প্রত্যাশা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ছিল ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নতুন বাংলাদেশের নতুন স্বাধীনতার বার্তা।


রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে ভারতের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সব রকম সম্ভাবনাই বাংলাদেশের আছে। পঞ্চান্ন্ বছর ধরে দেশে কৃত্রিম অস্থিরতা, বিভক্তি ও দুর্নীতির দুষ্টচক্রকে জিইয়ে রেখে সেই সম্ভাবনাকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা হয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী শাসনের দেড়দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া শত শত বিলিয়ন ডলারের একটা বড় অংশই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভারতে গিয়েছে। অতএব বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বিভক্তিকে নির্মূলের রাজনীতি ভারতের হেজিমনিক এজেন্ডার জন্য লাভজনক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া, অত:পর দেড় বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টান টান উত্তেজনা, একপাক্ষিক উস্কানি, হুমকি ও সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার যে ভারতীয় তৎপরতা দেখা গেছে, তা থেকে বাংলাদেশের সচেতন জনগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, ভারত বাংলাদেশকে কখনোই নিকটতম প্রতিবেশি বা ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গণ্য করেনি। তারা এখনো নাইন-ইলেভেন পরবর্তী পশ্চিমা ইসলামোফোবিক এজেন্ডা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত সম্পর্কের আওতায় বাংলাদেশকে ভারতের লেন্স দিয়ে দেখার পুরনো সমঝোতাকেই জিইয়ে রাখতে চাইছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ এনভয় ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপমন্ত্রী সার্জিও গোরকে দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেয়া এবং সেই গোর যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ঢাকা সফরের সময় দিল্লির রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদির সাথে বিশেষ বৈঠকে বসেন, তখন পর্দার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। সর্জিও গোরের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে কিছু উদ্ভিঘœ দেখা গেছে বলে অনেকে নানা রকম বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, দীনেশ ত্রিবেদি ও সার্জিও গোর নাকি প্রধানমন্ত্রীকে চীনের সাথে করিডোর ও তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে সতর্ক বার্তা দিয়ে গেছেন। তবে বাংলাদেশ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এসব বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়া হয়নি। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের পথ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে, এমন বার্তা যারা শুনতে চাইছেন, তাদের জন্য কোনো সুখবর আপাতত: নেই। ইরান যুদ্ধের বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খোদ মধ্যপ্রাচ্যেই শেষ হতে চলেছে। দক্ষিণ চীন সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিওনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। সেখানে চীনের শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ, কানেক্টিভিটি, প্রতিরক্ষা, তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে মার্কিন-ভারতের সাথে সমঝোতার যে কোনো প্রস্তাবে সাড়া দেয়া বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিতভাবেই আত্মঘাতী হবে। এক্ষেত্রে কাউকে হুমকি বা প্রতিপক্ষ না বানিয়ে আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখতে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ভূমিকা ও অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।


স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রবক্তা বীর-উত্তম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন জননেত্রি বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্য সন্তান তারেক রহমান ব্যক্তিগত, দলীয় ও পারিবারিকভাবে ভারত ও শেখ হাসিনার নির্মম অপরাজনীতির অন্যতম সাক্ষি ও ভুক্তভোগি। চীন সফরের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তারেক রহমানকে চীনের সাথে বাংলাাদেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার যুগান্তকারি ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। গার্মেন্ট রফতানি এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানির উদ্যোক্তা হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার মূল রূপকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম মেয়াদের মধ্যেই বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিনত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। প্রথম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর হিসেবে ভারতের বদলে চীনকে বেছে নেয়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি লাভে সক্ষম হওয়া তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে গণ্য হতে পারে। প্রবল বৈরী প্রতিপক্ষ বেষ্টিত ইরানের ওপর সাড়ে চার দশকের ধারবাহিক নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, হুমকি, টার্গেট কিলিং উপেক্ষা করে ইরানের সামরিক-রাজনৈতিক উত্থান থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গত এক দশকে বাংলাদেশ কিছু সাফল্যজনক দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষমও হয়েছে। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে গরু রফতানি বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশিদের গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু বাংলাদেশের খামারিরা ভারতের নিষেধাজ্ঞাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশের ডেয়ারি ও লাইভস্টক শিল্পকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি প্রতি বছর কোরবানির সময়ও প্রায় এককোটি গরু-মহিষের যোগান নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে দেশের খামারিরা। একইভাবে ধান-চাল, পেঁয়াজ, আলুসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যেও স্বনির্ভরতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশিদের শাস্তি দিতে মেডিকেল ট্যুরিজমসহ ভিসা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার পর চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন অনেকটা কমে আসা এবং ভারতের বিকল্প হিসেবে চীন, পাকিস্তান যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশি পর্যটক নির্ভর পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এসব বাস্তবতা স্বনির্ভর বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে বানিজ্য বৈষম্য ভারতের অনুকুলে হওয়ায় ভারতের নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকে ততটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবেনা। বাংলাদেশ সহজেই বিকল্প বাজার থেকে পণ্য ও কাচামাল সংগ্রহ করতে পারে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে কমমূল্যে তৈরী পোশাক আমদানি করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বানিজ্যিক ট্যারিফকে আধিপত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বাস্তবতায় বাংলাদেশকে মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিকিয়ে দিয়ে দলীয় ক্ষমতা ও আর বাণিজ্যিক সুবিধা টিকিয়ে রাখার ফাঁদ থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। চীনের হাত ধরে বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের স্থল যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ভারতের পানি আগ্রাসন, শুকনো মওসুমে পানি সমস্যা, বন্যা, নদীভাঙ্গন ও ফসলহানির সাংবাৎসরিক দুযোর্গ মোকাবেলা করে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের সুযোগ অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার সিস্টেম, বঙ্গোপসাগরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় শক্তিশালী নৌবাহিনী ও নজরদারি ব্যবস্থা কোনো প্রতিবেশির জন্য হুমকি নয়। ভারত যদি একে হুমকি হিসেবে মনে করে, তাহলে বুঝতে হবে তারা বিনা বাঁধায় বাংলাদেশের সম্পদ লুটে নিতে চায়। বাংলাদেশকে পিছিয়ে রাখতে চায়। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা নতুন বাংলাদেশ সে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews