বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার বাহারমর্দন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৩টার সময় সিলেট ও মৌলভীবাজার সফর শেষে নিজ গাড়িতে করে ঢাকা যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার হরিয়ালা নামক স্থানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার ঠিক আগের দিন শুক্রবার তিনি সিলেট এসে হযরত শাহজালাল ও শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেন। জুমার নামায আদায় করেন তার প্রিয় বন্দর বাজার জামে মসজিদে। মসজিদের উন্নয়নের জন্য দানও করেন লক্ষাধিক টাকা। সেদিন এক নজর তাকে দেখার জন্য মসজিদ প্রাঙ্গনে সমবেত হন অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী। সাইফুর রহমান তাদের সকলের সঙ্গে হাসিমুখে কথাবার্তা বলেন। উপস্থিত সকলেই তাঁর অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হন এবং সিলেটে উন্নয়ন কর্মকা-ে তার অবদানের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরদিন তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সিলেট আর মৌলভীবাজারেই শুধু নয় সারাদেশে এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শোকের ছায়া নেমে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ অনেক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ তাঁর মৃত্যুতে শুধু শোক প্রকাশ করেননি মর্মাহতও হয়েছেন অনেকেই।


সাইফুর রহমান যে একজন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন তা আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। সম্প্রতিকালে দেশের জনজীবনে এমনতর এক রাজনীতিকের উপস্থিতি খুবই প্রয়োজন। তিনি ছিলেন উদারপন্থী, দেশপ্রেমিক সংস্কারবাদী, বাস্তবতায় বিশ্বাসী এক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি। তাঁর উঠাবসা, চলাফেরা ছিল খুবই স্বাভাবিক, তিনি ছিলেন সহজ ও সরল মনের একজন মানুষ। তাঁর মধ্যে কোনো কপটতা বা কৃত্রিমতা কেউ কখনো খুঁজে পায়নি। এত জনপ্রিয় একজন নেতা দেশে এখন প্রায় দুর্লভ। জনকল্যাণে ছিলেন এমন দুর্দমনীয় যে, তিনি প্রায় এক মিথের আকার নিতে পেরেছিলেন। তাঁকে বলা হতো, তিনি রাজনীতিকেরও রাজনীতিক। জনকল্যাণে বিশেষ করে গরিবদের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ এ নেতা সব সময়ই নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে ভাবনাশ্রয়ী ছিলেন। এ অমায়িক সরল, নির্লোভ ও জনহিতে সতত নিবেদিতপ্রাণ গরিব অসহায় মানুষের বন্ধু মানুষটি তাঁর জাগরণে, স্বপ্নে ও সুষুপ্তিতে নিয়োজিত ছিলেন শুধু জনহিতার্থে। তাঁর আরো এক গুণ ছিল নিষ্কলঙ্ক, দুর্নীতিরহিত, ন্যায়পরায়ন ব্যক্তি হিসেবে। এ সাধারণ মানুষটি ছিলেন খোদাভীরু, পরহেজগার। ছোটবেলা থেকেই নৈতিক আচরণযুক্ত পুস্তকাদি পড়ে তিনি নিজেকে এক নৈষ্ঠিক পুরুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
সাইফুর রহমান ছিলেন মেধাবী। প্রথমে মৌলভীবাজার তারপর সিলেট এমসি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য যান লন্ডন। সেখানে তিনি একাউন্টেনসিতে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সংস্পর্শে এসে জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করে হয়ে গেলেন এক যথার্থ রাজনৈতিক নেতা। তবে তিনি ছিলেন সর্ব অর্থে একজন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নেতা। বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ জীবনে যতজন রাজনীতিকের সান্নিধ্য পাই তাদের বৃহদাংশ জনহিতে ব্যর্থ। এ সমস্ত অসমর্থ রাজনীতিকদের অনেকেরই যেন- তেন-প্রকারে অর্থ, আরো অর্থ ও বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়ার অভীপ্সা থাকে। এম সাইফুর রহমান এটি অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, জনগণের কল্যাণে বরাদ্দ অর্থের যদি নয়ছয় হয়, এ দুর্নীতির নায়কেরা একদিন না একদিন শাস্তি পাবেনই। এ ভাবনাকেন্দ্রিক হয়ে তিনি দেশের শিল্প ও সম্পদ বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে, কল্যাণের পরিধিকে আরো বিস্তৃত করে তাকে সর্বজনমুখী করতে সমর্থ হন। তাঁর মতে, দেশের উন্নয়ন করতে হলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হয়। তিনি হয়েছিলেনও তাই। তিনি তাঁর সারাটি জীবন সমাজ, দেশ, জাতির উন্নয়ন, উৎপাদন, অগ্রগতিতে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি ছিলেন সিলেট বিভাগের রূপকার, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সাইফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপকার। দেশের স্বার্থ ও কল্যাণে সব সময়ই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন তিনি।
দেশের সার্বিক উন্নয়নে তাঁর অবদান সর্ব মহলে স্বীকৃত। আমি একটি ছোট্ট ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। তখন সিলেটে ভেটেনারি কলেজ স্থাপন করা হয়। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং পশু সম্পদ মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান। আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে সে অনুষ্ঠনে আমিও উপস্থিত ছিলাম। আবদুল্লাহ আল নোমান সাহেব তাঁর বক্তব্যের শুরুতে বললেন, ‘মাননীয় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাহেব সিলেটের উন্নয়নে এতই আগ্রহী যে, আমি যখন মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে চট্টগ্রামে ভেটেনারি কলেজ স্থাপনের জন্য অর্থনৈতিক অনুমোদনের জন্য যাই, তখন মাননীয় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাহেব বললেন আমার সিলেটেও একটা ভেটেনারি কলেজ স্থাপন করতে হবে। নোমান সাহেব, আপনি সিলেট এবং চট্টগ্রামে দুটি কলেজ স্থাপনের জন্য প্রকল্প ও প্রস্তাবনা নিয়ে আসেন, আমি এক সঙ্গে দু’টিরই অনুমোদন দেব। টাকার সমস্যা হবে না, আমি ব্যবস্থা করব। হয়েছিলও তাই। এ থেকেই অনুমান করা যায়, সাইফুর রহমান সিলটের উন্নয়নের জন্য কতটুকু আন্তরিক ছিলেন। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান সাহেবের বাড়ি বৃহত্তর চট্টগ্রামে আর বাড়ি বৃহত্তর সিলেটে। বাংলাদেশ সরকারে প্রায় প্রতি জেলা থেকেই মন্ত্রীরা আছেন। প্রত্যেক মন্ত্রীই যদি নিজ নিজ এলাকা বা জেলার উন্নয়নে উৎসাহী ও আন্তরিক হন তাহলে সারাদেশেরই উন্নয়ন হবে।’
তাঁর মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ সব সময় উচ্চবিলাসী হয়ে থাকেন। তাই এক জীবনে সবকিছু আহরণ করে নেয়ার প্রবণতায় তাদের বৃহদাংশ ভিন্ন পথে দুর্নীতির বাতাবরণে যুক্ত হতে গররাজি হন না। এ জন্য সাধারণের মতো দেখতে এবং চলনে-বলনে অতি সাধারণ এ মানুষটি সর্বসাধারণ্যেই যুক্ত থাকতে সদাসর্বদা প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত মানুষেরা, যেমন ধীবর, চা শ্রমিক, পাট চাষী, ভূমিহীন চাষি, বস্ত্র শিল্পী ও চাকরির নিরাপত্তাহীন শিল্প শ্রমিকেরা যাতে মোটামুটি স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হন। এ জন্য তিনি দেশের অনেক কল্যাণকামী প্রকল্প হাতে নেন। বস্তিবাসী মানুষের আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রকল্পগুলো রূপায়নে মনোযোগী ছিলেন।
যোগ্যতার নিরিখেই এম সাইফুর রহমান এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি ১২ বার দেশের বাজেট ঘোষণা করার সুযোগ পেয়ে অর্থনীতিবিদ হিসাবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ভবিষ্যৎকালের বাংলাদেশের রাজনীতিক নেতাদের প্রতি অমলিন জীবন যেন তাঁর বাণী। তিনি বলতেন, যদি জনকল্যাণে সর্বাংশে ব্রতী থাক, তবে জনগণ তোমার পাশে থাকবে। নইলে তারা জানে কীভাবে ব্যর্থ, দুর্নীতিকামী ও লোভী নেতাদের ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews