॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥

কূটনীতি হলো সূক্ষ্ম প্রতীকের খেলা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে কোনো উপহারই কেবল একটি জড়বস্তু নয়; প্রতিটি বস্তু, পুস্তক বা স্মারকের পেছনে লুকিয়ে থাকে গভীর কোনো রাজনৈতিক দর্শন, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান কিংবা কৌশলগত বার্তা। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি বিশেষ গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। বইটি আর কিছুই নয়; প্রাচীন ভারতীয় কূটনীতিবিদ কৌটিল্য (যিনি চাণক্য নামেও অধিক পরিচিত) রচিত কুখ্যাত ও বহুল আলোচিত রাজ্য পরিচালনা বিষয়ক গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’। এই উপহার প্রদানের একটি ছবি ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসিয়াল পেজে প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে শাফকাত রাব্বি অনিক ও তাঁর পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম ‘সেন্ট্রিস্ট নেশন’ দাবি করে বসে যে, অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া বইটির প্রচ্ছদে কৌটিল্যের বহুল প্রচারিত কূটনীতি সূত্র লিখিত ছিল; ‘‘Every neighbouring state is an enemy and the enemyÕs enemy is a friend” (প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই মূলত শত্রু, আর শত্রুর শত্রু হলো বন্ধু)। এই দাবির পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনার পানি গড়ায় আরও দূরে, যখন ঢাকা স্থিত ভারতীয় হাইকমিশন তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দিয়ে শাফকাত রাব্বির ওই দাবিকে ‘ফেক নিউজ’ বা অসত্য বলে দাবি করে। হাইকমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা যে সংস্করণটি উপহার দিয়েছে, সেটির প্রচ্ছদে প্রবাদটি ছিল: “Education is the best friend. An educated person is respected everywhere” (শিক্ষাই শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একজন শিক্ষিত মানুষ সর্বত্র শ্রদ্ধেয়)। একজন সচেতন পাঠক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে কৌতূহলবশত বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখলাম, বিশ্ববাজারে ‘অর্থশাস্ত্র’-এর পেঙ্গুইন, অক্সফোর্ড ও অ্যামাজন সহ একাধিক সংস্করণ রয়েছে। কোনো কোনো সংস্করণের পেছনের প্রচ্ছদে বা ভূমিকায় কৌটিল্যের সেই কট্টর প্রতিবেশী-নীতি বা ‘মণ্ডল তত্ত্ব’ উদ্ধৃত করা রয়েছে, আবার কোনোটিতে শিক্ষাবিষয়ক সাধারণ নীতিবাক্য লেখা। ভারতীয় হাইকমিশন যে সংস্করণটি উপহার দিয়েছে, তাতে হয়তো দ্বিতীয় উক্তিটিই ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো; একটি প্রতিষ্ঠিত হাইকমিশন যখন খোদ একটি ফেসবুক পোস্ট বা মিডিয়া ইনফরমেশন ডিবাঙ্ক করতে মাঠে নামে, তখন তাদের বোঝা উচিত যে বিষয়টিকে স্রেফ ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ বইটির মূল নির্যাস তো একই! আর ‘ফেক নিউজ’ ডিবাঙ্ক করার কথা বলছেন ‘স্যার’ জি? ভারতে অবস্থিত আমাদের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও উপহাইকমিশন যদি কেবল ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশ, আমাদের গণঅভ্যুত্থান এবং আমাদের সার্বভৌমত্ব ঘিরে প্রতিদিন প্রচারিত হাজারও অসত্য, ভুয়া ও প্রোপাগান্ডামূলক সংবাদ ডিবাঙ্ক করতে বসে, তবে ঢাকা থেকে অতিরিক্ত জনবল পাঠাতে পাঠাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট শেষ হয়ে যাবে! তারপরও ভারতের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী ফেইক নিউজের প্রতিবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না? ফলে একটি বইয়ের প্রচ্ছদের লেখা নিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত প্রমাণ করার আগে ভারতীয় কূটনীতিকদের ভাবা উচিত ছিল; বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীকে এই বইটি উপহার দেওয়ার “আক্কেল” বা কৌশলগত যৌক্তিকতাটা ঠিক কী ছিল?

এক. কৌটিল্যে ‘অর্থশাস্ত্র’ উপহারের প্রচ্ছন্ন বার্তা বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে কৌটিল্য কে এবং তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থের মূল দর্শনটা কী। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে (প্রায় ৩২১-২৯৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে ক্ষমতায় বসানো এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনে মূল কারিগর ছিলেন ব্রাহ্মণ পরামর্শক বিষ্ণুগুপ্ত, যিনি ইতিহাসে ‘কৌটিল্য’ বা ‘চাণক্য’ নামে অমর হয়ে আছেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সামরিক কৌশল, অপরাধ বিচার ও কূটনীতির ওপর যে সমন্বিত দলিলটি রচনা করেন, সেটিই ‘অর্থশাস্ত্র’ নামে পরিচিত। রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক (মৌর্য যুগ), ১৫টি অধিকরণ (Books), ১৫০টি প্রকরণ এবং আনুমানিক ৬,০০০ শ্লোক। বইটির মূল বিষয়বস্তু হলো; নিরঙ্কুশ রাজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজ্য বিস্তার, গুপ্তচরবৃত্তি, করব্যবস্থা, শত্রু দমন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং কঠোর কূটনীতি। ইউরোপে রেনেসাঁ যুগে নিকোলো মেকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য প্রিন্স’ (The Prince) গ্রন্থে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, কৌটিল্য তাঁর চেয়েও প্রায় ১৮ শতক আগে ‘অর্থশাস্ত্র’-এ সেই নীতি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এ কারণেই ম্যাক্স ওয়েবার কৌটিল্যকে মেকিয়াভেলির চেয়েও কট্টর ও নির্মম বাস্তববাদী কূটনীতিবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

দুই. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় আবেগপ্রসূত দাবি ওঠে যে, কৌটিল্য তাঁর বইয়ে ‘বাংলাদেশ’ বা ‘মুসলমানদের’ বিরুদ্ধে কটু কথা লিখেছেন। একজন বস্তুনিষ্ঠ গবেষক হিসেবে এখানে তথ্য ক্রসচেক করা অত্যন্ত জরুরি। ঐতিহাসিক সত্য হলো; কৌটিল্য যখন অর্থশাস্ত্র রচনা করছেন (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে), তখন বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেনি (যা ঘটেছে সপ্তম খ্রিস্টাব্দে)। সুতরাং, প্রাচীন এই গ্রন্থে ‘মুসলিম’ শব্দ বা ইসলামের কোনো সরাসরি উল্লেখ থাকা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। একইভাবে, আধুনিক ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্র বা নামও তখন ছিল না; বঙ্গ বা পু-্র নামে ভৌগোলিক অঞ্চলের অস্তিত্ব ছিল। তবে, অর্থশাস্ত্রে যা আছে তা মুসলিম বা আধুনিক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি না হলেও, যেকোনো সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং অনার্য/অধীনস্থ জনগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্তার বিরুদ্ধে। কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রের সপ্তম অধিকরণে (Book VII: The Six Fold Policy/ ষাডগুণ্য) রাজমণ্ডল বা ‘মণ্ডল তত্ত্ব’ (Mandala Theory) ব্যাখ্যা করেছেন। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তিই হলো: “নিজের সীমানা সংলগ্ন প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই প্রাকৃতিক শত্রু (Natural Enemy), আর শত্রুর সীমানা সংলগ্ন রাষ্ট্রটি হলো প্রাকৃতিক মিত্র (Natural Friend)।” (Arthashastra, Book VII, Chapter 1, Verse 13-14, R.P. Kangle translation, University of Bombay)।

কৌটিল্য রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য ছদ্মবেশী যুদ্ধ, বিষপ্রযোগ, গুপ্ত হত্যা, প্রতারণা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির (ভেদ নীতি) স্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থশাস্ত্রের দ্বাদশ অধিকরণে (Book XII: Concerning a Powerful Enemy) এবং ত্রয়োদশ অধিকরণে (Book XIII: Means to Capture a Fort) কৌশলে দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে গ্রাস করার বা পঙ্গু করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, বইটি সরাসরি ‘বাংলাদেশ’ বা ‘মুসলমান’ নাম ধরে কিছু না বললেও, এর অন্তর্নিহিত দর্শন আধুনিক যেকোনো স্বাধীন-সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখ-তা এবং অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত হুমকিপ্রদ।

তিন. ভারত কি আজ চাণক্য নীতি অনুসরণ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি মতাদর্শিক ও কৌশলগত স্তম্ভকে আমাদের বুঝতে হবে। চাণক্য নীতি হলো রাষ্ট্র ও রাজনীতি পরিচালনার এমন এক ব্যবস্থা যা চার নীতি; সাম (আলোচনা), দাম (অর্থ বা প্রলোভন), দণ্ড (শাস্তি বা সামরিক শক্তি) এবং ভেদ (অভ্যন্তরীণ ফাটল সৃষ্টি) এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে সততা বা মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে পরম উদ্দেশ্য (সাম্রাজ্য বিস্তার বা প্রভাব বজায় রাখা) হাসিলই মুখ্য।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বাহ্যিকভাবে ‘পঞ্চশীলা নীতি’ ও নিরপেক্ষতার কথা বললেও, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের যে পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন, তা ‘নেহেরু ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। এই নীতির সারকথা হলো; দক্ষিণ এশিয়াকে ভারতের নিজস্ব প্রভাব বলয় (Sphere of Influence) হিসেবে দেখা হবে। এই অঞ্চলের যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বহিরাগত শক্তির প্রবেশ ভারত সহ্য করবে না এবং প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নীতি নির্ধারিত হবে দিলীøর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। এটি চাণক্যের ‘ম-ল তত্ত্বের’ই আধুনিক কূটনৈতিক সংস্করণ।

ব্রাহ্মণ্যবাদ কেবল একটি সামাজিক কাঠামো নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদী আদর্শ। এটি সমাজকে কঠোর বর্ণপ্রথা বা জাতপ্রথায় বিভক্ত করে একটি নির্দিষ্ট উচ্চবর্ণের চরম আধিপত্য নিশ্চিত করে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা প্রতিবেশীকে সমকক্ষ মনে না করে ‘ছোট ভাই’ বা ‘অধীনস্থ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করে।

বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং পরবর্তীতে আরএসএস (RSS) প্রবর্তিত হিন্দুত্ববাদ হলো একধরনের রাজনৈতিক চরমপন্থা, যা ভারতকে কেবল হিন্দুদের অখণ্ড পুণ্যভূমি হিসেবে কল্পনা করে। বর্তমান ভারতে শাসকগোষ্ঠী যে রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করছে, তা এই উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং চাণক্যীয় কূটনীতির এক মারাত্মক মিশ্রণ।

ভারত কি আজ চাণক্য নীতিতে চলে? উত্তর হলো; হ্যাঁ, শতভাগ। স্বাধীন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর নীতি পর্যন্ত কৌশলগত সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে এই চাণক্য নীতি ও নেহেরু ডকট্রিনের মেলবন্ধন। ভারতের আধুনিক কূটনীতির জনক বলে পরিচিত কে. এম. পানিক্কর থেকে শুরু করে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সবাই ভারতীয় কূটনৈতিক ঐতিহ্যের মূল শেকড় হিসেবে চাণক্যের অর্থশাস্ত্রকেই স্বীকার করেন।

চার. ভারতীয় হাইকমিশনের উপহার কী বার্তা বা ইঙ্গিত দিচ্ছে দিলী? এবার আসা যাক মূল প্রশ্নে। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যখন এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হলো, যখন বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদেহের একপেশে ও নতজানু কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘সার্বভৌম সমতা’ ও ‘মর্যাদাশীল সম্পর্কের’ দাবি তুলল; ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতীয় হাইকমিশনার কর্তৃক বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ‘অর্থশাস্ত্র’ উপহার দেওয়াকে স্রেফ একটি সৌজন্যমূলক উপহার ভাবাটা হবে চূড়ান্ত রাজনৈতিক মূর্খতা। ভারতীয় হাইকমিশন এই উপহারের মাধ্যমে ঢাকার নতুন নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের জনগণকে ঠিক কী ইঙ্গিত দিতে চাইছে? বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ১. কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হলো মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের বই। অর্থমন্ত্রীর হাতে বইটি তুলে দিয়ে দিল্লী যেন অনুচ্চারিতভাবে বার্তা দিতে চাইল; ‘‘আমরা তোমাদের প্রতিবেশীর রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চাণক্যীয় সূত্রগুলো ভালো করেই জানি। আমরা এখনো সেই শাস্ত্র দিয়েই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করি।” এটি একধরনের প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক হুমকি।

চাণক্যের সেই বিখ্যাত নীতি; ‘‘প্রতিবেশী মাত্রই শত্রু” যদি মনেও রাখা হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় দিল্লী বাংলাদেশকে কোনোদিন সমমর্যাদার বন্ধু মনে করেনি এবং করবেও না। বাংলাদেশকে তারা সবসময় চাণক্যীয় মণ্ডলের সেই ‘পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে, যাকে হয় প্রলোভন (দাম) দিয়ে, না হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল (ভেদ) সৃষ্টি করে, অথবা প্রয়োজনে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ (দণ্ড) দিয়ে বশে রাখতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ আশা করেছিল ভারত তাদের বহু বছরের ‘আওয়ামী লীগ-কেন্দ্রিক’ নীতি পরিবর্তন করে ‘জনগণকেন্দ্রিক’ কূটনীতিতে আসবে। কিন্তু অর্থশাস্ত্র উপহার দেওয়ার অর্থ হলো ভারত তার বহু পুরনো আগ্রাসী ও চাণক্যীয় পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনছে না। তারা এখনও চাণক্যের ছল-বল-কৌশল দিয়েই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে চায়।

পাঁচ. একজন দেশের অর্থমন্ত্রী বা অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারককে উপহার দেওয় যেতে পারতো কোনো আধুনিক অর্থনীতির বই, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিষয়ক কোনো প্রকাশনা, কিংবা পারস্পরিক ঐতিহ্যভিত্তিক কোনো স্মৃতিচিহ্ন। তার বদলে একটি চরম কট্টর, ষড়যন্ত্রমূলক ও যুদ্ধবাদী রাজতন্ত্রের নির্দেশিকা তুলে দেওয়া কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। ভারত যদি চাণক্য নীতি নিয়ে এগোতে চায়, তবে বাংলাদেশকে কী করতে হবে? বাংলাদেশকে হতে হবে বাস্তববাদী এবং কৌশলী। আবেগের ওপর ভিত্তি করে কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি চলতে পারে না। ভারতের কূটনীতিকরা কীভাবে চিন্তা করেন, তা বুঝতে হলে আমাদের নিজেদেরও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। প্রতিপক্ষ যখন চাণক্যের চাল চালবে, তখন সেই চাল ব্যর্থ করার মতো প্রস্তুত বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে অর্জন করতে হবে। চাণক্যের ‘ভেদ’ (ফাটল সৃষ্টি) নীতি যাতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে টুকরো টুকরো করতে না পারে, সেজন্য জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। ভারত যদি ‘দ-’ বা ‘দাম’-এর ভয় দেখায়, তবে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে নতুন মিত্র খুঁজে নিতে হবে (কৌটিল্যের ভাষাতেই; ’শত্রুর শত্রুকে মিত্র বানানো’ কিংবা বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক অক্ষ তৈরি করা)। ভারতীয় হাইকমিশন একটি বইয়ের পেছনের কভারের লেখা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ডিবাঙ্ক করার যে ‘পেলব’ নাটক করেছে, বাংলাদেশ সরকারকে তার পেছনে সময় নষ্ট না করে পরিষ্কার ভাষায় বলতে হবে ‘‘আমাদের সম্পর্ক হবে সমতা, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। চাণক্যের কোনো ছলচাতুরী বা প্রচ্ছন্ন হুমকি স্বাধীন বাংলাদেশে আর কাজ করবে না।”

পরিশেষে; কৌটিল্য বা চাণক্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ নিঃসন্দেহে প্রাচীন বিশ্বের এক অনন্য রাজনৈতিক দলিল। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামরিক কৌশল শেখার জন্য এটি একটি অমূল্য আকরগ্রন্থ। কিন্তু বিংশ বা একবিংশ শতাব্দীর স্বাধীন, সার্বভৌম এবং অগণিত শহীদের রক্তে অর্জিত একটি রাষ্ট্রের ওপর সেই খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের আধিপত্যবাদী তত্ত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে, দেশের সচেতন জনগণ তা চুপচাপ মেনে নেবে না। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র উপহার দিয়ে হয়তো ভেবেছিলেন তারা নিজেদের কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা এবং নতুন নেতৃত্ব দিলীøর এই ‘চাণক্য চাল’ ধরে ফেলেছে। ভারতের কূটনীতিকদের বুঝতে হবে চব্বিশের পর বাংলাদেশ আর আগের জায়গায় নেই। চাণক্যের প্রাচীন পাতা উল্টে আধুনিক সার্বভৌম বাংলাদেশকে রিমোট কন্ট্রোলে চালানোর দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন থেকে সম্পর্ক হবে চোখে চোখ রেখে, সমতার ভিত্তিতে নতুবা চাণক্যের ‘ম-ল তত্ত্ব’ ভারতের নিজেদের জন্যই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews