জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যদের কটাক্ষ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদের রূপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলকে উদ্দেশ্য করে অসংসদীয় মন্তব্য করেছেন অভিযোগ করে তিনি ওই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং কার্যবিবরণী থেকে তা এক্সপাঞ্জের দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও বাকবিতণ্ডার সময় ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম থেকেই বিরোধীদলীয় সদস্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে নিজের শ্রেণিকক্ষ মনে করছেন এবং নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় বসিয়ে অন্যদের ছাত্রের মতো শাসন করার চেষ্টা করছেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘শিক্ষকতা করতে হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আলাদা একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা উচিত। সেখানে তার পছন্দসই শিক্ষার্থীরা গিয়ে ভর্তি হবে।’
সরকারের এ ধরনের আচরণকে সংসদীয় ফ্যাসিবাদের রূপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদের সৌন্দর্য ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার অসংসদীয় বক্তব্যের জন্য অবিলম্বে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বক্তব্যটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তা না হলে বিরোধীদলের সদস্যরা অপমান সহ্য করে সংসদে অবস্থান করবেন না।’ তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কার্যপ্রণালী থেকে এক্সপাঞ্জ করার জন্য স্পিকারের প্রতি দাবি জানান।
এ সময় সংসদে হট্টগোল, অসৌজন্যমূলক আচরণ ও কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সময় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এবং বাকবিতণ্ডার পর তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন, সংসদে অসহিষ্ণুতা ও একে অপরকে কথা বলতে না দেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
স্পিকার বলেন, জাতীয় সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে সচল ও সংসদকে কার্যকর রাখতে হলে কার্যপ্রণালী বিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাকবিতণ্ডা এবং বিরোধীদলীয় সদস্যদের হট্টগোলের সমালোচনা করে স্পিকার বলেন, সরকারি দলের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা বিরোধীদলের রয়েছে। তবে একজন মন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে সমস্বরে চিৎকার করে তার বক্তব্য বাধাগ্রস্ত করা সুস্থ সংসদীয় রীতি হতে পারে না।
নিজের ৪০ বছরের সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে স্পিকার অতীতের তিক্ত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি কার্যকর ও ভালো সংসদ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্য তার নেই।
স্পিকার বলেন, বক্তব্য দেওয়া ও অন্যের বক্তব্য শোনার ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতা না থাকলে দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে।
পরে আবার আলোচনায় অংশ নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসংসদীয় বক্তব্য স্পষ্ট এবং এ ধরনের মন্তব্য বারবার ঘটছে। অতীতের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বক্তব্যটি কার্যপ্রণালী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রেজারি বেঞ্চে সদস্যসংখ্যা বেশি থাকার বিষয়ে স্পিকারের বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সংসদকে সংখ্যা বা গুণের ভিত্তিতে বিভক্ত করার পক্ষে তিনি নন। ভালো কাজে বিরোধীদল সবসময় সরকারের সঙ্গে একাত্ম থাকবে, আবার অন্যায় হলে প্রতিবাদও জানাবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সব সংসদ সদস্যকে সমান মর্যাদা দিয়ে সংসদ পরিচালনা করা হবে—এমনটাই বিরোধীদলের প্রত্যাশা।
সবশেষে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন স্পিকার। তিনি জানান, মনিরুল হক চৌধুরীকে ঘিরে যে ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত না থাকায় বিষয়টি কার্যপ্রণালী দেখে পরীক্ষা করবেন। কোনো অসংসদীয় বক্তব্য থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব সংসদ সদস্যের প্রতি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে স্পিকার বলেন, যেভাবে একে অপরকে বাধা দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্পিকার যখন কোনো সদস্যকে বসতে বলেন, সেই নির্দেশ বা সংসদীয় রীতি না মানলে সংসদ বেশিদিন সচল রাখা সম্ভব হবে না।
পরে সংসদে চরম বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান স্পিকার। এরপর আসরের নামাজের বিরতির জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়।