ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিদায়ের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এই এক সপ্তাহে সুশীলদের এই সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির খবরে আমরা স্তম্ভিত। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ রিকশাচালক পর্যন্ত যেন দম বন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক কালের কণ্ঠে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘সপ্তাহখানেক ধরে ভালো আছি।’ একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখলাম, একজন রিকশাচালক বলছেন, ‘ইউনূস সরকার গেছে, এখন আর কথায় কথায় রাস্তায় অবরোধ নাই, এখন ভালো আছি।’ ইউনূস সরকারের বিদায়ে সর্বত্র যেন স্বস্তির সুবাতাস। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্পোদ্যোক্তা, ছোট্ট চাকুরে থেকে গৃহিণী পর্যন্ত সবাই যেন অবশেষে প্রাণভরে নিশ্বাস নিচ্ছেন, মুক্তির আনন্দ উদ্্যাপন করছেন। ইউনূস সরকার বিদায় নিয়েছে, এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুখবর। একটি সরকারের বিদায়ে কেন মানুষের এত খুশি, এত আনন্দ? এর কারণ অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের অপশাসন। গত ১৮ মাস দেশ পরিচালনার নামে অন্তর্র্বর্তী সরকার এক স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্ব কায়েম করেছিল। মব সন্ত্রাস, আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন, লুটপাট এবং দুর্নীতির উৎসব শুরু করেছিল। সাধারণ মানুষ ছিল অসহায়। তারা নীরবে মুখ বুঝে সরকারের সমর্থনপুষ্ট মব বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করেছে। অনেকেই ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনকালকে সত্যজিত রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’র সঙ্গে তুলনা করেন। আবার কেউ কেউ তুলনা করেন ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকারের সঙ্গে। লক্ষণীয় এই যে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ২০০৭ সালের অনির্বাচিত সরকার এবং ড. ইউনূস সরকারের মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুটি সরকারই ক্ষমতায় এসেছিল একটি রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে। দুই সরকারেই সুশীলদের প্রাধান্য ছিল। দুই সরকারই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল বিপুল জনসমর্থন নিয়ে। কিন্তু দুটি সরকারই বিদায় নেয় চরম অজনপ্রিয় হয়ে। দুটি সরকারই রাজনৈতিক সংস্কারের নামে দেশে বিরাজনীতিকরণ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিল। জোর করে জনমত উপেক্ষা করে কিছু বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার মাইনাস ফর্মুলার রাজনৈতিক সংস্কার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর জুলাই সনদের নামে ইউনূস সরকার নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছিল। দুই সরকারই দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়। দুটি সুশীল সরকারই বেসরকারি খাত ধ্বংসের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার যেমন বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের হেনস্তা, গ্রেপ্তার, হয়রানি করে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি করে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে বেআইনিভাবে বেসরকারি খাতের ইমেজ নষ্ট করার চেষ্টা করে। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে ধ্বংস করার চক্রান্ত করে। ঠিক একইভাবে ইউনূস সরকারও বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হয়রানি, তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা দায়ের, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে ইউনূস সরকার যেন এক-এগারোর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এক-এগারোর সরকার যেমন গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে মরিয়া ছিল। সুশীল সমাজের মুখপত্র দুটি গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের, ব্যবসায়ীদের চরিত্রহননের খেলা শুরু করেছিল ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের সরকার, ইউনূস সরকার এটার বিস্তার ঘটায় ব্যাপকভাবে। এক-এগারো সরকার যেমন একটি পেটোয়া বাহিনী তৈরি করেছিল, বারী, আমিনের মতো কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল রাষ্টীয় মব বাহিনী। এরা যাকে খুশি তুলে নিয়ে যেত, যার কাছে ইচ্ছা চাঁদা আদায় করত। ড. ইউনূস মব বাহিনী ছড়িয়ে দেন সারা দেশে। ইউনূসের মব বাহিনী গঠিত হয় মূলত কতিপয় বিপথগামী তরুণকে নিয়ে। যাদের পেছনে অন্তর্র্বর্তী সরকারের মদত ছিল। এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এক-এগারোর সরকারের বর্ধিত রূপ ছিল ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার। ফখরুদ্দীন যা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু করতে পারেননি, সেটাই সমাপ্ত করতে চেয়েছিলেন ড. ইউনূস। দুটি সরকারের সবচেয়ে বড় মিল হলো মিথ্যা আশ্বাসের ফুলঝুরি। ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে জনগণকে নানা রকম প্রলোভন দেখাতেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, আর অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে গোয়েবলসীয় আশ্বাসের ডালি সাজিয়ে বসেন ড. ইউনূস। ২০০৭ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইনের আশ্বাসে মানুষ যতটা না মোহিত হয়েছিল, তার চেয়ে শত গুণ সম্মোহিত হয় ২০২৪ সালে ড. ইউনূসের কথায়। মানুষ ড. ইউনূসের এসব কথামালায় প্রথমে রোমাঞ্চিত হয়েছিল। যদিও পরে বাস্তবতার ধাক্কায় মোহভঙ্গ হয়। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে দুটি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারের মেয়াদ ছিল চার বছরের কিছু কম। কিন্তু এই ৪২ মাস বাংলাদেশ একটি বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। এই ৪২ মাস বাংলাদেশের মানুষের জন্য অন্ধকারকাল। এই সময়ে আমরা উপলব্ধি করেছি, এ দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দেশ পরিচালনায় অযোগ্য, অক্ষম। তারা ক্ষমতার বাইরে থেকে চমৎকার কথা বলেন, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে নিজেরাই তা মানেন না। এই সুশীলরা যা বলে তা করে না। যা করে তা বিশ্বাস করে না। যা বিশ্বাস করে তা বলে না। এদের মুখে মধু অন্তরে বিষ। বাংলাদেশের সুশীল সমাজের যারা ক্ষমতা দখল করতে চান, তারা আসলে ধূর্ত, লোভী এবং দুর্নীতিমনস্ক। সুযোগ পেলে এরা যে কী ভায়ানক দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়, সদ্য বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি তার প্রমাণ। বাংলাদেশের দুটি সুশীল শাসন কেন ব্যর্থ হলো, তা নিয়ে গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে আমাদের সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে না। তারা প্রচণ্ড স্বার্থপর। এরা ক্ষমতায় যেতে চায় জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে নয়, বরং নিজেদের ভাগ্য বদলাতে। আমাদের সুশীলদের প্রভাবশালী অংশটির দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে নয়, বরং তাদের বিদেশি প্রভুদের প্রতি। দুটি সুশীল শাসন প্রমাণ করে দিয়েছে যে হিতোপদেশ দেওয়া সহজ কিন্তু বাস্তবে দেশ চালানো কঠিন। দেশ পরিচালনার জন্য আমাদের সুশীল সমাজ মোটেও যোগ্য নন। রাষ্ট্র পরিচালনা রাজনীতিবিদদের কাজ। কাজটা তাদেরই করা উচিত। সুশীল সমাজের কাজ হলো টক শো, সেমিনারে সুন্দর কথা বলা। যার যেটা কাজ সেটা নিয়েই আমরা থাকি না কেন?