মালদার সন্ধ্যার কথা দিয়েই শুরু করা যাক। ২ এপ্রিল, ২০২৬। জাতীয় সড়ক নম্বর বারোর(১২) ওপর বাঁশ, আসবাবপত্র ও পোড়া টায়ারের ব্যারিকেড। শত শত মানুষ রাস্তায়। বিডিও বা ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসের ভেতরে বিচারিক আধিকারিকরা জিম্মি। টানা নয় ঘণ্টা। পুলিশের গাড়ির ওপর পাথর নিক্ষেপ হয়েছিল। এতে পেশাদার অপরাধীরা জড়িত ছিল না। শিক্ষক, কৃষক ও দোকানদারের মতো সাধারণ মানুষই এতে অংশ নিয়েছিল। তাদের কারও বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ডও ছিল না। তবু তারা ওইদিন রাস্তায় নেমেছিল, কারণ ব্যবস্থা তাদের এতটাই কোণঠাসা করে ফেলেছিল যে, আর কোনও পথ ছিল না। তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই ঘটেনি; পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই একই চিত্র দেখা গেছে। এর পেছনে ছিল স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫ সালের নভেম্বরে এসআইআর শুরু হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় রাজ্যের প্রতি ছয়জন ভোটারের মধ্যে একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ ৬১ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। আরও ৬০ লক্ষ মানুষকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’র নামে এক অদ্ভুত নতুন বিভাগে ফেলা হয়েছে, নাম তার ‘আন্ডার এয্যুকেইশন’ বা ‘সন্দেহভাজন ভোটার’। এই বিভাগে পড়া মানুষের নাম মুছে দেওয়া হয়নি, আবার নিশ্চিতও করা হয়নি। মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যেন তারা নাগরিকও নয়, অনাগরিকও নয়।

এই সন্দেহভাজন বিভাগে পড়ার মানদ- কী ছিল? যদি নামের বানানে সামান্যতম অমিল থাকে, ‘মুহাম্মদ’-এ অ-র জায়গায় ইউ হলে, ‘ম-ল’-এ এ-র জায়গায় অ হলে, সরাসরি সন্দেহভাজন। পিতা-পুত্রের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম বা ৪৫ বছরের বেশি হলে, সন্দেহভাজন। লিঙ্গ পরিচয়ে গরমিল থাকলে, সন্দেহভাজন। ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে সরকারি দলিলে বানান ভুল একটি স্বাভাবিক ঘটনা, যেখানে বিশ বছর আগে কোনও সরকারি বাবু যা লিখেছিলেন সেটাই চিরন্তন সত্য হয়ে যায়, সেখানে একটি বানানের ভুলের জন্য মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ১৯৫২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৩ বার এসআইআর হয়েছে, কিন্তু এই ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ বা ‘আন্ডার এয্যুকেইশন’ বলে কোনও বিভাগ আগে কখনও ছিল না। হয় কেউ বৈধ ভোটার, নয় বৈধ নয়। মাঝামাঝি কোনও জায়গা থাকার কথা নয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ছিল একটি সফটওয়্যার। সফটওয়্যারটি ২০ বছর পুরনো ভোটার তালিকা স্ক্যান করে বর্তমান তালিকার সঙ্গে মিলিয়েছে। যেখানেই সামান্য অমিল পেয়েছে, সেই ভোটারকে ফ্ল্যাগ করা হয়েছে। দ্য রিপোর্টার্স কালেক্টিভ (একটি স্বাধীন ও অলাভজনক ভারতীয় তদন্তধর্মী সাংবাদিকতার সহযোগী সংগঠন, যার উদ্দেশ্য ক্ষমতাশালীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা) যখন এটি তদন্ত করল, জানা গেল এই সফটওয়্যার মোতায়েনের আগে পরীক্ষাই করা হয়নি। একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন, এই সফটওয়্যার ৯৫ শতাংশ নির্ভুল ছিল, না ৬০ শতাংশ, সেটা তারও জানা নেই। ৬১ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার নির্ভর করছে এমন একটি সফটওয়্যারের উপর যার নির্ভুলতার হিসাব নির্বাচন কমিশনেরই জানা নেই। পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক স্বীকার করেন, সফটওয়্যারটি ঠিকমতো কাজ করেনি। এটি কোনও ছোট ত্রুটি ছিল না। ২৪ মার্চের সেই সন্ধ্যায় সফটওয়্যারটি একটানে পশ্চিমবঙ্গের সাত কোটি ভোটারকে একসঙ্গে সন্দেহভাজন বিভাগে ফেলে দিয়েছিল। দুই ঘণ্টা পরে ‘টেকনিক্যাল গ্লিচ’ বলে সামলানো হলো। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আদেশ জারির কাহিনী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এমন নির্দেশ দিয়েছেন, যা নির্বাচন কমিশনের লিখিত নির্দেশের বিরোধী। স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকদের বলা হয়েছে, অফিসিয়াল সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ভোটারদের অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করতে। লিখিত নির্দেশ বা সরকারি গেজেট ছাড়াই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার ভিত্তিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই এআইআরের আসল লক্ষ্য কী ছিল? বলা হয়েছিল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বের করা। বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন, এক কোটিরও বেশি নাম বাদ যাবে, যার বড় অংশ হবে বেআইনি বাংলাদেশি অভিবাসী। কিন্তু তথ্য একদম উল্টো কথা বলছে। সারা পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ৪.৩ শতাংশ ভোটার পাওয়া গেছে যাদের ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলোতে এই অমিলের হার সবচেয়ে কম, ডোমকল, রানীনগর এবং হরিহরপাড়ায় ক্রমান্বয়ে ০.৪২ শতাংশ, ০.৯১ শতাংশ এবং ০.৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি অমিল কোথায়? মতুয়া সম্প্রদায়ের আসনগুলোতে, যেখানে গড় ৯.৪৭ শতাংশ, অর্থাৎ রাজ্যের গড়ের দ্বিগুণ। মতুয়ারা দলিত হিন্দু শরণার্থী, ’৪৭ সালের পর বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষ। অনুপ্রবেশকারীদের সরানোর উদ্দেশ্য সামনে আনা হলেও ক্ষতির মুখে পড়েছে মূলত হিন্দু দলিত শরণার্থীরাই। আসামের এনআরসি প্রক্রিয়ায়ও এমনটাই দেখা গিয়েছিল।
যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা দেখলে চমকে উঠতে হয়। কারগিল যুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিক মুহম্মদ দুয়াল আলি, যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন, সেনাবাহিনীর নথি দেখিয়েও নিজেকে ভারতীয় প্রমাণ করতে পারেননি। কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শহীদুল্লা মুন্সি, যিনি এখন পশ্চিমবঙ্গ ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান, তাঁর নামও তালিকা থেকে মুছে গেছে। তাঁর স্ত্রী ও ছেলে সন্দেহভাজন তালিকায়। তিনি বলেছেন, এটি অত্যন্ত অপমানজনক। মিডিয়ায় খবর হওয়ার পরে রাতারাতি তাঁর নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে সাধারণ মানুষের মিডিয়া অ্যাক্সেস নেই, আইনি জ্ঞান নেই, তিনি কী করবেন? নবাব পরিবারের উত্তরসূরি ৮২ বছর বয়সী সৈয়দ রেজা আলি মির্জা এবং তাঁর ছেলে ফাহিমের নামও মুছে গেছে। বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার ঋচা ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা চিফ সেক্রেটারি নন্দিনী চক্রবর্তী, রাজ্য সরকারের দুই মন্ত্রী শশী পাঞ্জা ও মুহম্মদ গুলাম রব্বানি এমনকি যেসব বিএলও (বুথ লেভেল অফিসার) অন্যদের তথ্য যাচাই করছিলেন, তাঁরাও সন্দেহভাজন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

ডেটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা গল্প আরও উদ্বেগজনক। আর্টিকেল ফোরটিনের তদন্তে দেখা গেছে, যে ১০টি জেলায় সবচেয়ে বেশি সন্দেহভাজন ভোটার, তার মধ্যে ৯টিতে মুসলিম ভোটার ৫০ শতাংশ বা তার বেশি। মুর্শিদাবাদ, যেখানে ৬৬ শতাংশ মুসলিম, সেখানে ১১ লক্ষ ভোটার ক্ষতিগ্রস্ত। কলকাতার একটি ওয়ার্ডে মুসলিম ভোটার ৫০ শতাংশ, কিন্তু সন্দেহভাজন তালিকায় তাদের অংশ ৮২ শতাংশ। মেটিয়াবুরুজে ৬০ শতাংশ মুসলিম, কিন্তু সন্দেহভাজন তালিকায় ৮৭ শতাংশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসন ভবানীপুরে মুসলিম জনসংখ্যা ২০ শতাংশ, কিন্তু সন্দেহভাজন তালিকায় তারা ৫২ শতাংশ। রানীনগরের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বুথে সন্দেহভাজনের হার ৩ শতাংশ, একই নির্বাচনকেন্দ্রের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বুথে সেই হার ৫৮ শতাংশ। একই সফটওয়্যার, একই নিয়ম, একমাত্র পার্থক্য জনগোষ্ঠীর পরিচয়।

তথ্য আরও বলছে, ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির চেয়ে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েছিল। এবার ভোটার তালিকা থেকে ঠিক ততগুলোই ভোট মুছে গেছে। বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৩৪টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারের সংখ্যা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। যে তিনটি জেলায় ৪২ শতাংশ সন্দেহভাজন ভোটার, সেই জেলাগুলোতে ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ২৫০০ থেকে ৪০০০ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল। কিন্তু এর উল্টো দিকেও একটা গল্প আছে। যখন বৈধ ভোটার বাদ দেওয়া হচ্ছে, তখন কি বাইরের মানুষের নাম যোগ করা হচ্ছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, বিজেপি বিহার, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের মানুষের নাম বাংলার ভোটার তালিকায় ঢোকাচ্ছে। একদিনে ৩০ হাজার ফর্ম ৬ (নতুন ভোটার হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করতে হয়) জমা পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রাজনৈতিক দলের এজেন্ট দিনে মাত্র ৫০টি ফর্ম ৬ জমা দিতে পারেন। কিন্তু তৃণমূল সমর্থিত একটি সংস্থা এক বিজেপি কর্মীকে ৪০০টি ফর্ম ৬ নিয়ে যেতে দেখেছে, যার ভিডিও প্রমাণও আছে।

ডেটা লুকানোর চেষ্টাও কম হয়নি। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা শুধু স্ক্যান করা পিডিএফ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে, যা সার্চ-অ্যাবল নয়, মেশিন-রিডেবলও নয়। ফাইলের আকার যেখানে ১ এম-বি হওয়ার কথা, সেখানে ২২৮ এম-বি করা হয়েছে। প্রতিটি ফাইল ডাউনলোডের আগে ক্যাপচা বসানো হয়েছে যেন কোনও অটোমেশন কাজ না করতে পারে। প্রায় ১০ শতাংশ ভোটার এন্ট্রিতে ‘আন্ডার এয্যুকেইশন’র ওয়াটারমার্ক দেওয়া আছে যেন এআই বা ম্যানুয়াল অ্যানালাইসিস দিয়েও ডেটা বিশ্লেষণ করা না যায়। নির্বাচন কমিশন নিজে থেকে সন্দেহভাজন ভোটারদের নাম প্রকাশ করতে রাজি ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেই বাধ্য হয়ে প্রকাশ করতে হয়েছে।
এই সব বাধার মুখেও ‘অল্ট নিউজ’র (২০১৭ সালে প্রতীক সিনহা এবং মোহাম্মদ জুবায়ের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ভারতীয় অলাভজনক ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট) দল ৫৫৮টি পিডিএফ ম্যানুয়ালি প্রক্রিয়া করে ৩ লক্ষ ৫২ হাজার ভোটার রেকর্ড ডিজিটাইজ করেছে এবং পাবলিক ডেটাবেস তৈরি করেছে, যা বাংলার মানুষের পাশাপাশি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে।

মালদার ওই পুড়ে যাওয়া টায়ারের ঘটনার প্রসঙ্গে আসা যাক। সেদিন রাস্তায় নামা মানুষরা আইন ভঙ্গ করেছিল ঠিকই, তবে তাদের সেই পদক্ষেপের পেছনের কারণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার, হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া অনানুষ্ঠানিক নির্দেশ, নতুন সন্দেহভাজন শ্রেণি তৈরি এবং লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে দেওয়াকে প্রশাসনিক ত্রুটি বলা যায় না; এগুলো ছিল সুস্পষ্ট প্যাটার্নের একটি অংশ। দিল্লি নির্বাচনে এই প্যাটার্ন দেখা গেছে, মহারাষ্ট্রেও দেখা গেছে এমনকি আসামের ‘এনআরসি’তেও একই প্যাটার্ন নজরে এসেছে। এবার সেটা দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গে।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews