দূর থেকে দেখা যায় সাদা রঙের এক বিশাল প্রাসাদ। সামনে প্রশস্ত সিঁড়ি, মাথার ওপর গম্বুজ, চারপাশে সবুজের সমারোহ। কাছে যেতেই চোখ আটকে যায় স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কারুকাজে। একসময় যেখানে জমিদারদের আনাগোনা ছিল, আজ সেখানে ইতিহাসের খোঁজে আসেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা। সময় বদলেছে, বদলে গেছে মানুষের জীবনও; কিন্তু রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে।
রংপুর শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে তাজহাট এলাকায় অবস্থিত এই প্রাসাদ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি, ব্যবসা, স্থাপত্য, ঔপনিবেশিক সময়ের সামাজিক ইতিহাস এবং উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ গল্প।
তাজহাট নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা। প্রাচীন রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকায় একসময় মূল্যবান পাথর ও অলংকারের ব্যবসা জমজমাট ছিল বলে জানা যায়। ব্যবসার উদ্দেশ্যে সুদূর পাঞ্জাব থেকে এখানে এসেছিলেন মান্না লাল রায়। তার হাত ধরেই এলাকায় তাজ বা অলংকারের ব্যবসার প্রসার ঘটে। কথিত আছে, তাজ বিক্রির সেই জমজমাট বাজার থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার নাম হয়ে ওঠে ‘তাজহাট’।
আজ সেই তাজহাট বাজারের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে জমিদার পরিবারের স্মৃতি বহনকারী বিশাল প্রাসাদটি।
বর্তমান তাজহাট বাজার থেকে প্রধান ফটক পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে জমিদার বাড়ির মূল ভবন। ব্যস্ত শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, অথচ প্রাসাদের চৌহদ্দিতে ঢুকলেই পরিবেশে আসে অন্যরকম নীরবতা। মনে হয়, আধুনিক সময়ের কোলাহল পেরিয়ে কেউ যেন হঠাৎ কয়েক দশক আগের রংপুরে পৌঁছে গেছে।
মান্না লাল রায়কে তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার বংশধরদের হাত ধরেই তাজহাট জমিদারির বিস্তার ঘটে।
রাজা গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। স্বাধীনচেতা ও জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিত গোবিন্দ লাল পরবর্তী সময়ে ‘রাজা’, ‘রাজা বাহাদুর’ এবং ‘মহারাজা’ উপাধি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরবর্তী সময়ে তার ছেলে গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্ব নেন। তার সময়েই তাজহাট জমিদার বাড়ির বর্তমান প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সাল—প্রায় এক দশক ধরে চলে নির্মাণকাজ। বিভিন্ন নকশা ও কারুকাজে তৈরি করা হয় বিশাল এই ভবন। নির্মাণে যুক্ত ছিলেন প্রায় দুই হাজার নির্মাণশিল্পী—এমন তথ্যও পাওয়া যায়।
প্রাসাদের সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই চোখে পড়ে প্রশস্ত সাদা মার্বেলের সিঁড়ি। সিঁড়িটি সরাসরি দোতলায় উঠে গেছে। সাদা মার্বেল, লাল ইট ও চুনাপাথরের ব্যবহারে ভবনটি পেয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।
প্রায় ৭৬.২০ মিটার দীর্ঘ ও ১৫.২৪ মিটার প্রশস্ত এই প্রাসাদের মাঝখানে রয়েছে বড় একটি গম্বুজ। সম্মুখভাগে রয়েছে বারান্দা, স্তম্ভ ও ত্রিকোণাকৃতির স্থাপত্য উপাদান। ওপর থেকে দেখলে ভবনটির আকৃতি অনেকটা ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো বলে মনে হয়।
প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন আকারের কক্ষ, বারান্দা, অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা এবং দরবার হল। ওপরের তলায় ওঠার জন্য রয়েছে কাঠের সিঁড়িও।
তবে তাজহাটের সৌন্দর্য শুধু ভবনের দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। চারপাশের সবুজ পরিবেশ, ফুলের বাগান, আম-কাঁঠাল-মেহগনি ও কামিনী গাছ, নারকেলগাছ এবং পুকুরগুলো প্রাসাদটিকে দিয়েছে আলাদা আবহ।
একসময় যেখানে জমিদার পরিবারের ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রকাশ ঘটত, আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা স্থাপত্যের ছবি তোলেন, ইতিহাসের গল্প শোনেন এবং অতীতের সঙ্গে নিজেদের মতো করে যোগাযোগ তৈরি করেন।
তাজহাটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে জমিদারি প্রথার অবসানের পর।
১৯৪৭ সালের পর ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং জমিসহ তা কৃষি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ ভবনটি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহারের জন্য উদ্বোধন করা হয়।
ফলে যে প্রাসাদ একসময় জমিদারদের প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল, সেটিই একসময় হয়ে ওঠে বিচারিক কার্যক্রমের স্থান। রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি ছিল ইতিহাসের এক ভিন্ন অধ্যায়।
১৯৯১ সালে হাইকোর্ট বিভাগের কার্যক্রম এখান থেকে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৫ সালে ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে এর সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।
২০০২ সালে প্রাসাদের একটি অংশে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে তাজহাট জমিদার বাড়িকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে এটি রংপুর জাদুঘর হিসেবে পরিচিত।
জাদুঘরে ঢুকলেই জমিদার আমলের গল্পের সঙ্গে মিশে যায় আরও পুরোনো ইতিহাস। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, পাথরের মূর্তি, বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি, ধাতব সামগ্রীসহ নানা প্রত্ননিদর্শন।
সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় ও সাহিত্যিক পাণ্ডুলিপি, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় লেখা দলিল, মহাস্থানগড়ের পোড়ামাটির ফলক, কালো পাথরের বিষ্ণুমূর্তি, শিবলিঙ্গ, প্রাচীন মুদ্রা এবং বিভিন্ন সময়ের ব্যবহার্য সামগ্রী।
জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত কিছু সামগ্রীও এখানে সংরক্ষিত আছে। ফলে দর্শনার্থী শুধু একটি প্রাসাদ দেখেন না; একই সঙ্গে দেখতে পান উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা নিদর্শন।
শীতের সকালের তাজহাটের পরিবেশ অন্যরকম। প্রাসাদের সামনের খোলা জায়গায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ স্থাপত্যের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ জাদুঘরের ভেতরে পুরোনো নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে দেখছেন।
রংপুরের বাসিন্দা আহসান খান মনে করেন, তাজহাটের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি পর্যটন সুবিধাও বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, উন্নত আবাসন, ক্যাফেটেরিয়া ও যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়বে।
একই ধরনের মত স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও। তাঁদের মতে, তাজহাটকে শুধু একটি পুরোনো ভবন হিসেবে নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটনের সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।