দীর্ঘ দেড় যুগ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুমসহ দুঃসহ নির্যাতন ভোগের পর প্রায় চার মাস আগে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নেতারা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। কেউ পেয়েছেন অন্য দায়িত্ব। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরকারি কাজকর্মে। বিপরীতে যাদের আন্দোলন-সংগ্রামের বদৌলতে রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের নেই কোনো মূল্যায়ন। সরকার চাঙ্গা হলেও দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের স্থবিরতা কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। যদিও পুরনো সেই অভিযোগ আবারো সামনে আসছে। হাইব্রিড, মাই ম্যান ও আর্থিক লেনদেনের কাছে হার মানতে হচ্ছে মাঠে থাকা পরীক্ষিতদের। ত্যাগ আছে; কিন্তু মূল্যায়ন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মুখে মুখে। দল থেকে বহিষ্কার বা পদ পাবেন না এমন ভয়ে অনেকেই এখন নীরব।
সূত্র মতে, সম্প্রতি কিছু কমিটি হলেও সেখানে রাজনীতিতে সক্রিয়দের রাখা হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, ভাঙচুর, নেতাদের অবাঞ্ছিত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতেও যদি এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, তাহলে তৃণমূলসহ সর্বস্তরে অস্থিরতা আরো বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে স্থানীয় নির্বাচনসহ সরকার পরিচালনায়।
বিএনপির দায়িত্বশীল অনেকে বলছেন, নির্বাচনের পর অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। এতে সাংগঠনিক কার্যক্রমে একধরনের শূন্যতা বা শৈথিল্য তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, গত ১৭ বছর বিএনপির যেসব নেতাকর্মী নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের যথার্থভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, হয়তো হবেও না। এর কারণ হাইব্রিডে বিএনপি এখন জমে গেছে।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে ন্যাশনাল রিসার্চ সেল (এনআরসি) আয়োজিত এক সেমিনার শেষে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম এ প্রতিবেদককে বলেন, নির্যাতিত বিএনপি নেতাকর্মীদের যথার্থভাবে মূল্যায়ন না হওয়ায় আমি শঙ্কিত। কারণ বিএনপি এখন হাইব্রিডে ভরা। অতীতে যাদের ত্যাগতিতিক্ষা রয়েছে, জেল খেটেছে, অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করেছে- সেসব নিবেদিত কর্মীর মূল্যায়ন না হলে আমাদের আরো দুঃখ পেতে হবে, কষ্ট পেতে হবে। তিনি বলেন, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, ধান্দাবাজ, ডাণ্ডাবাজ- এই বাজদের কারণে বিএনপি সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে।
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাজপথে বিএনপি যখন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল তখন মিটিং-মিছিল বা সমাবেশে খুব কম নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ করা যেত। দলকে ভালোবাসে এমন কিছু ত্যাগী কর্মী বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাঠে ছিল : কিন্তু পটপরিবর্তন হওয়ার পরপরই যেন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন যেন সবাই বিএনপি। দলের বিপদের সময় মাঠে না থাকলেও এখন তাদের ব্যানার-ফেস্টুনে এলাকা সয়লাব। নতুন এসব বিএনপির নেতাকর্মীর ভিড়ে ত্যাগীরা যেন কোণঠাসা। নব্য গজিয়ে ওঠা এসব নেতা দলের নাম ভাঙিয়ে করছেন নানান অপতৎপরতা। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও এসব সুবিধাবাদীদের দাপট। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দলটির ত্যাগী এবং দুঃসময়ে নেতাকর্মীরা চরম বিব্রত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ অবস্থায় সুবিধাবাদী শ্রেণীর ব্যক্তিরা দলের প্রতিটি জায়গায় গেড়ে বসতে শুরু করেছেন। দলের দুঃসময়ে এরা কখনোই বিএনপির রাজনীতিতে না থাকলেও বর্তমানে হর্তাকর্তা হয়ে উঠছেন। এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তৃনমূল কর্মীদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, নেতারা তাদের দল ভারী করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পকেট কমিটি করেছে। যাতে এলাকায় নিজের প্রভাব বা আধিপত্য ধরে রাখা যায়। এ ছাড়া বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও কমিটিসহ বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে এসব বহিরাগতরা।
রাজশাহী জেলা ছাত্রদল নেতা আল আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, নব্য বিএনপি যারা ৫ আগস্টের পরে নেতা হয়েছে তারা দলে ঢুকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। যারা বিগত সময়ে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সাথেও ছিল তারা আবার এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি করছে। আমরা এসব ঘটনায় বিব্রত।
দলটির নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সুদিন ফিরে আসায় অনেক সুবিধাবাদী দলে ভিড়তে শুরু করেছেন। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কমিটিতে নতুন নতুন নাম শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগের আনুকূল্যে ব্যবসাবাণিজ্য করেছেন কিংবা আন্দোলনের সময় নিরাপদে বিদেশে ছিলেন, তারাই এখন বিএনপি ও অঙ্গদলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চোধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, দলে হাইব্রিড ও সুবিধাভোগীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে, এরকম অভিযোগ আমরা শুনছি। এ ছাড়া এতদিন আওয়ামী লীগ করছে, এখন বিএনপি করছে, এমন কথাও বলা হচ্ছে। আমরা এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছি। যারা ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রেখেছে, দল তাদেরই মূল্যায়ন করবে।
সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এটা শুধু বিএনপির নেতাকর্মীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দল-সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যেও বিস্তার করেছে। সাংবাদিক, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, শিক্ষক থেকে শুরু করে অন্যান্য পেশার মধ্যেও দৌরাত্ম্য বেড়েছে। অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, হাইব্রিড নেতাদের বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। দলে যোগদান অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপির ৮২ কমিটির মধ্যে এখন ৭২টি মেয়াদোত্তীর্ণ। শুধু সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি নয়, সারা দেশে বিএনপির থানা-উপজেলা এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিলে নতুন কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে বছরের পর বছর পার হলেও নতুন কমিটি আর হচ্ছে না।
ঢাকা ও ফরিদপুরে একটিরও মেয়াদ নেই। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় একটি ছাড়া সব মেয়াদোত্তীর্ণ। রাজশাহী ও খুলনায় সাতটির মেয়াদ নেই। বরিশালে আটটি সাংগঠনিক ইউনিট কমিটির মধ্যে একমাত্র পটুয়াখালী জেলার মেয়াদ রয়েছে। রংপুর বিভাগে ১০টি এবং সিলেট বিভাগে পাঁচটি সাংগঠনিক ইউনিট। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলা কমিটি গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত হয়। সিলেট বিভাগের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বরে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ময়মনসিংহের মেয়াদ আছে দু’টির।
দলসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যদি ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করে পকেট কমিটি, মাই ম্যান কমিটি করা হয়, তাহলে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাবেন একসময়ের ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা।