সাঁতারের নীল জলে যে মেয়েটি একসময় ঝড় তুলেছিল, সে আজ আর নিয়মিত পুলে নামে না। কিন্তু তার গল্প থেমে যায়নি, শুধু পথ বদলেছে। সাঁতারু জুনাইনা এখন চিকিৎসক হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আর মাত্র কয়েক মাস, তারপর হাতে পাবেন বহুদিনের লালিত স্বপ্নের সনদ। এক জীবনের অধ্যায় শেষ হয়ে আরেক জীবনের সূচনা-এই রূপান্তরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন আলোর গল্প। কিছুদিন আগেও দেশের সাঁতার অঙ্গনে জুনাইনা আহমেদ ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম। প্রবাসে বেড়ে ওঠা এই তরুণী দ্রুত নিজের প্রতিভা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন সবার নজরে। তার সাঁতারে ছিল গতি, দৃঢ়তা আর এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস, যা তাকে আলাদা করে তুলেছিল। মনে হয়েছিল, বাংলাদেশ হয়তো এক দীর্ঘ পথের সঙ্গী পেয়ে গেছে। ২০০৩ সালের ৩০ জুন লন্ডনে জন্ম নেওয়া জুনাইনার শিকড় সুনামগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই সাঁতারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আধুনিক প্রশিক্ষণ আর নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন তাকে গড়ে তোলে। বাবা জুবায়ের আহমেদ বুঝেছিলেন, মেয়ের এই পথচলা বিশেষ কিছু হয়ে উঠতে পারে। সেই বিশ্বাসই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

২০১৭ সালে মিরপুর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে জাতীয় বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জুনাইনা যেন এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেন। ১১ ইভেন্টে অংশ নিয়ে ১০টি স্বর্ণপদক জয় এবং আটটি জাতীয় রেকর্ড-এ যেন এক তরুণ প্রতিভার বিস্ময়কর আত্মপ্রকাশ। সেই মুহূর্তে তিনি শুধু একজন ক্রীড়াবিদ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন ভবিষ্যতের এক প্রতিশ্রুতি। পরের বছরগুলোতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ২০১৯ সালে সিনিয়র পর্যায়ে এসে তিনি আবারও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেন। প্রথমবার সিনিয়রদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই দুটি জাতীয় রেকর্ড ভেঙে দেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে অংশ নিয়ে হয়ে ওঠেন দলের নির্ভরতার নাম। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি পিছিয়ে থাকেননি। বিশ্ব সাঁতার প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশীয় গেমস-সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। এসএ গেমসে চারটি ব্রোঞ্জ পদক জয় ছিল তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যা দেশের সাঁতারে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। অলিম্পিক, যে স্বপ্ন প্রতিটি ক্রীড়াবিদের হৃদয়ে থাকে-সেই স্বপ্নও ছুঁয়ে দেখেছেন জুনাইনা। টোকিও অলিম্পিকে অংশ নিয়ে নিজের সেরাটা দিয়েছেন, ভেঙেছেন ব্যক্তিগত রেকর্ড। হয়তো পদক আসেনি, কিন্তু দেশের পতাকা বুকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে নামার যে সাহস ও গর্ব, তা কোনো অর্জনের চেয়ে কম নয়। এরপর তার জীবনে এসেছে নতুন মোড়। পড়াশোনা, নতুন লক্ষ্য, নতুন স্বপ্ন-সব মিলিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন এক পথ। পুল থেকে সরে গেলেও থেমে থাকেননি; নিজেকে গড়ে তুলছেন অন্য এক পরিচয়ে, যেখানে তিনি মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে অংশ নেবেন। এই গল্পে তাই হারিয়ে যাওয়ার বেদনার পাশাপাশি রয়েছে নতুন সম্ভাবনার আলোও।

এই আলোয় নতুন করে দেখা দেয় আরেকটি নাম-জুমাইমা। ছোট বোন হিসাবে যাকে ঘিরে এক সময় প্রত্যাশা ছিল, আজ সে নিজেই তৈরি হচ্ছে নিজের পথে হাঁটার জন্য। বাবা জুবায়েরের কণ্ঠে আশার সুর, ‘জুনাইনা পুল থেকে পা তুলে নিলেও তৈরি হচ্ছে আমার আরেক মেয়ে জুমাইমা। সে এখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ে, আশা করি এ বছরের শেষদিকে জাতীয় সাঁতারে অংশ নেবে।’ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রবাসী প্রতিভাদের আসা-যাওয়া নতুন নয়। প্রতিটি গল্পই আমাদের শেখায়, প্রতিভা কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু রূপ বদলায়। কখনো তা পুলের জলে ঢেউ তোলে, কখনো তা মানুষের জীবনে আলো হয়ে ফিরে আসে। জুনাইনার অনুপ্রেরণা ছিলেন মাইকেল ফেলপস। তার স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য বড় কিছু করা। আজ সেই স্বপ্ন হয়তো অন্য পথে এগোচ্ছে, কিন্তু লক্ষ্য একটাই, নিজেকে প্রমাণ করা এবং দেশের জন্য কিছু করা। জুনাইনা-জুমাইমার গল্প তাই কেবল হারিয়ে যাওয়ার নয়; এটি সম্ভাবনার গল্প, নতুন শুরুর গল্প। এক সময় যে পুলে আলো ঝলমল করত, আজ সেখানে হয়তো নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও লুকিয়ে আছে নতুন ঢেউয়ের অপেক্ষা, যেখানে আবার কেউ নামবে, আবার জল কাঁপবে, আবার স্বপ্ন জাগবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews