বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রবাসী আয় নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে মানুষ যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, তা অর্থনীতির এসব ইতিবাচক সূচকের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি কোনো একদিনে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা নয়। গত কয়েক বছর ধরে এর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও চাপে পড়ে। ২০১৯ সালে যেখানে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ২০২২ সালের পর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বহু মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি কিংবা তারও ওপরে অবস্থান করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে চিহ্নিত করছেন অর্থনীতিবিদরা। গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, বেড়েছে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচও। অর্থনীতির বাস্তবতা হলো, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কখনোই একটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, সেবা এবং খুচরা বাজারÑ সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে। ফলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতে অতিরিক্ত খরচ হয়। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে নেয়। শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপ এসে পড়ে ভোক্তার ওপর। বাজারে চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, মাছ, মাংসÑ সব কিছুর দামই বাড়তে থাকে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পুরোপুরি সামাল দেওয়ার আগেই বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। শিল্পকারখানা, সেচ কার্যক্রম, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি গৃহস্থালির ব্যয়ও বিদ্যুতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন, আগামীতে মূল্যস্ফীতি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।
উদ্বেগজনক দিক হলো, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলেও মানুষের আয় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। অথচ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম তার চেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, মজুরি বৃদ্ধির হার যদি মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তাহলে মানুষ বাস্তবে দরিদ্র হয়ে পড়ে। একজন শ্রমিক বা চাকরিজীবীর বেতন বাড়লেও সে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে সক্ষম হয়। এই বাস্তবতা আজ দেশের লাখো পরিবার অনুভব করছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। নি¤œআয়ের মানুষের জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণি মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক সহজে সামাল দিতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। তাদের আয় সীমিত, অথচ বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং খাদ্য ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালানো কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। মাছ, মাংস, দুধ, ফলমূলের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের হার হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। মূল্যস্ফীতির পেছনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত কয়েক বছরে ডলারের বিনিময় হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় জ্বালানি, গম, ভোজ্যতেল, শিল্প কাঁচামাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে এবং সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যমূল্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার শর্ত পালন করতে গিয়ে সরকারকে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়, ভর্তুকি হ্রাস, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে সংস্কারের মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এসব পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সুদের হার বৃদ্ধি বা মুদ্রানীতির মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতির সাফল্যের প্রকৃত মানদ- রিজার্ভের পরিমাণ, প্রবৃদ্ধির হার কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান। মানুষ যদি বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্বাভাবিক দামে কিনতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তার কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে না। অতএব, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেবল অর্থনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জনকল্যাণের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষের সঞ্চয়, ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন সময় এসেছে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার। কারণ, যে অর্থনীতি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না, সেই অর্থনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
[email protected]