রাজস্ব আদায় বাড়াতে জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মাগুরার জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবের পর পর্যালোচনা শেষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রস্তাবের পক্ষে মাগুরার জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে। মাসিক অগ্রগতি, ঘাটতির কারণ ও সমাধান আলোচনা রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়াবে। শক্তিশালী কমিটি গঠনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। করদাতাদের শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে রাজস্ব ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে।
গত ৩ মে শুরু হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় কার্য-অধিবেশন অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়াবলি সংক্রান্ত আলোচনায় এই প্রস্তাবটি উঠে আসে। এই অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন- পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো: নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর মোস্তাকুর রহমান, এতে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
সম্মেলনে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব বলেন, ফেনী জেলা রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তিনি প্রকল্পের এক্সিট প্ল্যান বিষয়টি প্রকল্প ডিজাইনের শুরুতেই অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রকল্প সমাপ্তির পর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার জন্য অর্গানোগ্রাম এবং টি ও অ্যান্ড টি প্রস্তুতের পরামর্শ দেন।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব বলেন, প্রকল্প মনিটরিংয়ের জন্য ই-পিএমআইএস সফটওয়্যার চালু রয়েছে। জেলা প্রশাসকরা এই প্লাটফর্ম ব্যবহার করে প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়মিত মনিটর করত পারেন। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব বলেন, সরকারি প্রাপ্তি ই-চালান ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা দেয়া সম্ভব। স্ট্যাম্প ডিউটিও এ ব্যবস্থায় আনা হলে জালিয়াতি রোধ ও রাজস্ব তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বলেন, কৃষক কার্ড সুবিধার আওতায় সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ফ্রি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ইনক্লুশান ও এক্সক্লুুশান সংক্রান্ত ত্রুটি কমাতে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য বালাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিম রয়েছে, যা অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জানেন না। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করেন।
অর্থ বিভাগের সচিব বলেন, সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে। তিনি এলএ কন্টিনজেন্সি খাতে অব্যবহৃত অর্থ পুনরদ্ধারে জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট, ক্যাশলেস সোসাইটি এবং ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট ধারণা বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা কামনা করেন।
মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক বলেন, পেনশনভোগীদের ভোগান্তি কমাতে সরকার একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ২৫টি দফতরের পারফরম্যান্স অডিট চালু রয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রকিউরমেন্ট অডিট, পরিবেশ অডিট ও আইটি অডিট শুরু করা হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেও সরকার সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নকে নির্বাচনী ইশতেহার, এসডিজি এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সাথে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রকল্প অনুমোদন ও ডিজাইন প্রক্রিয়া দ্রুততর করার আহ্বান জানান। তিনি আইএমইডি শক্তিশালীকরণ এবং জেলাপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকায় প্রশংসা করেন। তিনি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দাতব্য নয়; বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন এবং জেলা প্রশাসকদের চার দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্দেশনাগুলো হলো- নন-এনবিআর রাজস্ব বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ এবং লক্ষ্য নির্ধারণ; জেলা প্রশাসনের কাঠামোগত ইউনিট (যেমন এডিসি এডুকেশন, এডিসি ডেভেলপমেন্ট) আরো কার্যকর করা; জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট ইফেকটিভনেস নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রেরণ; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ করার নির্দেশনা দেন।