‘সমাজের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই’- মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন অঙ্গীকারের কথা বলেন। প্রায় দুই দশক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করায় দলটির মধ্যে স্বস্তির আবহ তৈরি হলেও বাস্তবতা হলো- দেশের রাজনীতি ও সংসদীয় কার্যক্রমে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে একাধিক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে দলীয় ঐক্য অটুট রাখা, বিরোধী শক্তিকে সংসদ ও রাজপথে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে মোকাবেলা করা এবং সরকার পরিচালনায় প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন- এসবই এখন বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা মনে করেন, ক্ষমতায় ফিরে আসা স্বস্তিদায়ক হলেও আগামী পথ মোটেই মসৃণ নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই সরকার ও দল- দুই ক্ষেত্রেই তারা কৌশলগত পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিরোধী শক্তিগুলো নতুন কৌশল ও শক্তি নিয়ে মাঠে নামবে- এমন ধারণা থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মও সরকারবিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকার গঠনের এক মাস পার হলেও জনমনে এখনো নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে? পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন? অতীতের মতো দমন-পীড়ন, মিথ্যা মামলা, দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি থেকে দলটি কতটা বেরিয়ে আসতে পারবে? প্রায় দুই দশক আগের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।

এ ছাড়া প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, আওয়ামী লীগ আমলের সহিংসতা ও দমননীতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না- এসব বিষয়ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে।

বিএনপি অতীতে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমানের আচরণ, বক্তব্য ও কর্মপদ্ধতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ব্যক্তিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; দলীয় কাঠামো ও তৃণমূলের আচরণগত পরিবর্তন না এলে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন কঠিন হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিএনপিকে আরো দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জনসংযোগ বৃদ্ধি এবং সরাসরি জনগণের মতামত শোনা- এসব বিষয় গুরুত্ব পেলে সরকার পরিচালনায় আস্থা বাড়বে।

অন্যদিকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, অর্থনীতি, নগরায়ণ, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। বৈদেশিক শক্তিগুলো নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে সক্রিয় থাকায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

দলীয় নেতারা বলছেন, তাদের লক্ষ্য- দেশের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাদের ভাষায়, দেশের মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না; তারা চায় শান্তি, নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিত হওয়া।

তবে সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যে দলীয় রাজনীতিতে একধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, যা একসময় আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এখন অনেকটাই নিস্তরঙ্গ। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বড় কোনো কর্মসূচি না থাকায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও একধরনের নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপরও। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল, আর এখন নেতৃত্বের ব্যস্ততায় অনেক ক্ষেত্রে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিএনপির ১১টি সহযোগী সংগঠনের মধ্যে বেশির ভাগের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে- যা সংগঠন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

দলীয় সূত্র বলছে, এই পরিস্থিতি দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নজরে এসেছে। সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি ইতোমধ্যে সংসদ সদস্যদের সাথে নিয়মিত বৈঠক শুরু করেছেন এবং পর্যায়ক্রমে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠনের পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অধিক সময় দিতে হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় দলের অনেক শীর্ষ নেতা থাকায় দলীয় কার্যক্রমে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে শিগগিরই দল ও সরকার- দুই ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক গতি ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, সংসদীয় কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনই হবে অগ্রাধিকার। অন্য দিকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলকে একটি গতিশীল ও সুসংগঠিত শক্তিতে রূপান্তরের কাজ দ্রুত দৃশ্যমান হবে।

নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।

এদিকে নানা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রথম অধিবেশনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় দেখা গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সংসদ কতটা কার্যকর ও স্থিতিশীল হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সংসদীয় কার্যক্রম শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, বিরোধীদের মোকাবেলায় তারা সংবিধানকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে সামনে আনবেন। সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে জুলাই সনদের বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের লক্ষ্য- সংসদকে কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যাতে জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধান সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব হয়।

দলটির দাবি, প্রথম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে, তা ইতিবাচক রাজনীতির ইঙ্গিত দেয়। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি, বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং অসংসদীয় আচরণ পরিহার করে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, দলটি গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়ন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ করা এবং সংসদকে জাতীয় ইস্যুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সাথে ‘রেইনবো নেশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ক্ষমতায় ফেরার স্বস্তি থাকলেও বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-আস্থা অর্জন, দলকে সংগঠিত রাখা এবং একটি কার্যকর ও গণমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই তিনটি ক্ষেত্রেই তাদের সাফল্য নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews