বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন বায়োটেক জায়ান্ট মডার্না (Moderna) ও মার্ক (Merck)-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি ক্যানসারের এমআরএনএ (mRNA) ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ইতিবাচক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাফল্য ক্যানসার গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আর এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বজুড়ে বায়োটেক খাতে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তার পূর্ণ সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে চীনের বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানগুলো।
দক্ষিণ চীন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম সাউথ চীন মর্নিং পোস্ট (SCMP)-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চীনে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি ক্যানসার ভ্যাকসিন তৈরির কার্যক্রম বা প্রোগ্রাম চলমান রয়েছে। হংকংয়ের শেয়ার বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে—লিকা শিং-সমর্থিত 'সিকে লাইফ সায়েন্সেস' এবং 'এভারেস্ট মেডিসিন্স'-এর মতো চীনা বায়োটেক সংস্থাগুলোর শেয়ার দর হু হু করে বাড়ছে।
কীভাবে কাজ করবে এই পার্সোনালাইজড ক্যানসার ভ্যাকসিন?
এই প্রতিষেধকগুলো সাধারণ ভাইরাসের ভ্যাকসিনের মতো প্রতিরোধমূলক নয়, বরং চিকিৎসায় ব্যবহৃত (Therapeutic) ভ্যাকসিন।
ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা (Personalised Treatment): প্রতিটি ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর টিউমার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার জিনগত মিউটেশন পরীক্ষা করা হয়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জাগ্রত করা: এরপর রোগীর নিজস্ব টিউমারের জন্য নির্দিষ্ট এমআরএনএ ডিজাইন করে দেহে ইনজেক্ট করা হয়, যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমের 'টি-সেল' (T cell)-কে উদ্দীপ্ত করে ক্ষতিকর ক্যানসার কোষ চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
চীনা বাজারের সম্ভাবনা ও খরচ
চীনে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষ ক্যানসারে মারা যায়। বিশাল এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই চীনা ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাগুলো যেমন—জিয়াংসু হেংরুই, লিকাং লাইফ সায়েন্সেস এবং এভারেস্ট মেডিসিন্স তাদের উদ্ভাবন ও পরীক্ষা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
বেইজিংভিত্তিক 'লিকাং লাইফ সায়েন্সেস' জানিয়েছে, তাদের তৈরি নিজস্ব পার্সোনালাইজড এমআরএনএ ক্যানসার ভ্যাকসিনের ৬টি ডোজের পুরো কোর্সের খরচ ১০০,০০০ ইয়ানের (প্রায় ১৪,৯০০ মার্কিন ডলার) নিচে রাখা সম্ভব হতে পারে। পশ্চিমা বিশ্বের চিকিৎসা খরচের তুলনায় এটি অনেক সাশ্রয়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতামত
এশিয়ার হেলথকেয়ার রিসার্চ সংস্থা 'জেফ্রিস'-এর প্রধান কুই কুই জানান, "চীন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ক্যানসার ভ্যাকসিনের বড় পাইপলাইন তৈরি করেছে। তবে মডার্নার সাফল্য মেলানোমা (এক ধরনের ত্বক ক্যানসার)-এর বাইরে অন্যান্য জটিল টিউমারের ক্ষেত্রে কীভাবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুৎপাদন করতে পারে, সেটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।"
গবেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, চীনে এই সংক্রান্ত বেশির ভাগ গবেষণাই এখনো ফেইজ-১ বা ফেইজ-২ ট্রায়াল বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির সাফল্য ক্যানসার জয়ের যুদ্ধে মানবজাতিকে এক ধাপ এগিয়ে দিল। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।