• চীনের চার দফা প্রস্তাবে ইরানের সমর্থন
  • এ মুহূর্তে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা নেই
  • সৌদী-ইরান ২৪ ঘণ্টায় দ্বিতীয়বার

বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে ইরান। দেশটি বলেছে, মার্কিনীরা যুদ্ধ বন্ধে তাদের কাছে যেসব দাবিদাওয়া করছে সেগুলো অযৌক্তিক।

গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের জবাব দেয় ইরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানীদের দেওয়া পাল্টা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেছেন এটি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। এরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন বার্তা দেওয়া হলো। টাইমস অব ইসরাইল, আনাদোলু, আল-জাজিরা,

গতকাল সোমবার ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘেই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি— এগুলো এ অঞ্চলে সংঘাত ও দমন-নিপীড়নের একটি উদাহরণ।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে যেসব দাবি জানিয়েছে এগুলো অযৌক্তিক। অপরদিকে ইরান যেসব দাবি জানিয়েছে তার সবগুলো সম্পূর্ণ যৌক্তিক।’

ইসমাঈল বাঘেই জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিনিদের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার ও জলদস্যুতা বন্ধ এবং যেসব ব্যাংকে ইরানের অর্থ জব্দ করা রাখা হয়েছে সেগুলো অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। যার সবগুলোই সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু এর পরদিনই ইরানী বন্দরে নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইরান দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের চুক্তি চায় তাহলে সবার আগে অবরোধ তুলতে হবে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে ইরানকে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দিতে হবে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতি: ইরানের জবাবে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও রাখা হয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহঘনিষ্ঠ আল মায়াদিন টিভির বরাতে জানা গেছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি আলোচনায় তেহরানের অন্যতম ‘লাল দাগ’ বা ‘অনড় অবস্থান’।

ইরান জানিয়েছে, লেবাননে উত্তেজনা কমাতে হলে স্পষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়েছে, কোনো চুক্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধ বন্ধ হতে হবে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর অবস্থান: ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতিও দাবি করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, এই কৌশলগত জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে— এমন কোনো কাঠামো তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে।

আলোচনার প্রথম ধাপে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

পারমাণবিক কর্মসূচি: এক ইরানী কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের জবাবের মূল লক্ষ্য পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধ করা, বিশেষ করে লেবাননে, এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতপার্থক্য নিরসন করা।’

তিনি জানান, ইরানের জবাবে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জবাব যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতসংক্রান্ত দাবিগুলো পূরণ করেনি।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ মুহূর্তে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা নেই

আলোচনায় অগ্রগতি না হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু হওয়ার শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান। দেশটি বলেছে, তারা তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

গত রোববার ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ বন্ধের একটি পাল্টা প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি প্রত্যাখ্যান করেন। এতে করে আবারও হামলা ও পাল্টা হামলা শুরুর শঙ্কা তৈরি হয়। এরপরই পাকিস্তান জানাল আপাতত পুনরায় যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা নেই।

সোমবার বার্তাসংস্থা আনাদোলুকে পাকিস্তান সরকারের কয়েকটি সূত্র বলেছেন, তারা আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।

এখন আর যুদ্ধ শুরু হবে না উল্লেখ করে এক কর্মকর্তা বলেছেন, “চলমান অচলাবস্থা সত্ত্বেও পাকিস্তান এখনই যুদ্ধের কোনো আশঙ্কা দেখছে না। কারণ, সংঘাত মেটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কূটনৈতিক পথ খুঁজছে।”

এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প চীনে যাবেন। তিনি চান না তার সফরটি যুদ্ধের আড়ালে পড়ে যাক।

পাকিস্তানের অপর একটি সূত্র জানিয়েছেন, যদিও দুই দেশ প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু তাদের মধ্যে ভেতরের একটি পথ রয়েছে। যার মাধ্যমে যোগাযোগ চলছে। এতে কাতার, মিসরের মতো একাধিক আরব দেশ যুক্ত রয়েছে। আর সবকিছুর মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান।

চীনের চার দফা প্রস্তাবে সমর্থন ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্থাপিত চার দফা প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছে ইরান। চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দোলরেজা রাহমানি ফাজলি বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই নিরাপত্তা ও যৌথ উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তেহরান এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিচ্ছে।রাষ্ট্রদূত ফাজলি এক বিবৃতিতে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও উত্তেজনার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে ইরান সবসময়ই কূটনৈতিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, চীনের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে।তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। উভয় দেশই বিশ্বাস করে, সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে সংলাপ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সংকট সমাধান সম্ভব। এর আগে বেইজিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চার দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন। যদিও ওই পরিকল্পনার বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে এতে যুদ্ধবিরতি, আঞ্চলিক সংলাপ জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে চীনের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন তাৎপর্য বহন করছে। বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে চীন এখন ক্রমেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।এদিকে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সমঝোতাভিত্তিক কূটনৈতিক পদক্ষেপই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি করতে পারে।

সৌদির মন্ত্রীর সঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় মধ্যে দ্বিতীয়বার আলাপ আব্বাস আরাঘচির

সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুইবার কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সর্বশেষ গতকাল সোমবার তাদের মধ্যে ফোনালাপ হয়। এ সময় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার ব্যাপারে আলোচনা করেন তারা।

ইরানী বার্তাসংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ফোনালাপের মাধ্যমে গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা দুইবার একে-অপরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায়। এরপর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ইরান যৌথ হামলার জবাবে আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একট যুদ্ধবিরতি হয়। ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি দখলদার ইসরাইলও মেনে নেয়। এরপর থেকে আর যুদ্ধ শুরু হয়নি। কিন্তু দুই দেশ আলোচনার মাধমে কোনো সমাধানেও পৌঁছাতে পারেনি।

যুদ্ধবিরতিটি গত ২২ এপ্রিল শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধি করেন।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায়। গতকাল রোববার তেহরান এটির জবাব দেয়। কিন্তু ট্রাম্প তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, ইরান যে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে সেটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews