কিডনি রোগ নীরবঘাতক। উপসর্গ দেখার আগেই কিডনির নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত। কারণ কিডনি রোগের চিকিৎসা যেমন- ডায়ালাইসিস, ট্রান্সপ্লান্ট ব্যয়বহুল। শুরুতে কিডনি রোগ নির্ণয় করা গেলে নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। রোগ প্রতিরোধে ভেজাল খাবার খাওয়া যাবে না। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে অতিরিক্ত ওজন, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস।
বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে রোববার দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ের যুগান্তর ও ওষুধ কোম্পানি বীকন ফার্মাসিউটিক্যাল আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। এবার কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে।’ কিডনি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারনাজ নবীর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত। উপস্থিত ছিলেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার ও নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন।
আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ (অবসর) অধ্যাপক ডা. ইমরান বিন ইউনুস। কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-আর-রশিদ, সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের ইউরোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবু সালেহ আহমেদ, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের নেফ্রোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. রাশেদ আনোয়ার, কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, বাংলাদেশ আ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজি সোসাইটির সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পপুলার মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম মুহিবুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ও মুগদা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. রেজাউল আলম, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেজবাহ উদ্দিন নোমান, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহ নেওয়াজ দেওয়ান, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালক এসএম মাহমুদুল হক পল্লব ও দৈনিক যুগান্তরের স্বাস্থ্যপাতার সম্পাদক ডা. ফাহিম আহমেদ রুপম প্রমুখ।
আলোচনার শুরুতে উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, দেশে বিপুল পরিমাণ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু কীভাবে হচ্ছেন অনেকেই তা জানেন না। রোগটি প্রতিরোধে কী করণীয় বোঝেন না। সে লক্ষ্যেই আজকের গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন। বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলতে পারবেন মানুষের কিডনি সুস্থ রাখতে করণীয় কী। আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ যুগান্তরে ভালোভাবে তুলে ধরতে চাই।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে কিডনি রোগসহ এ রকম বড় বড় সমস্যা এক ধরনের পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস। আমাদের যে জীবনযাপনের রীতি তাতে এসব সমস্যা না কমে বরং বাড়তে থাকবে। এ কারণে আমাদের সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দিচ্ছে। আমরা মূলত বিদ্যমান জনসম্পদ ও পরিত্যক্ত অবকাঠামোগুলো ব্যবহার করতে চাই। এক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে যথাযথ জায়গায় পদায়ন নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, সারা দেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারকর্মী নিয়োগ করা হবে, যাদের ৮০ ভাগ হবেন নারী। এসব কর্মীকে জটিল রোগ চিহ্নিত করাসহ প্রাথমিক বিষয়গুলো প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাদের মাধ্যমে সব রোগের পাশাপাশি সারা দেশে কিডনি রোগ প্রতিরোধেও সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা হবে। এক্ষেত্রে যথাযথ ফল পেতে সরকার রেফারেল লিংক নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা হবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকার ই-হেলথ কার্ড নিয়ে কাজ করছে।
ডা. হারুন-অর-রশীদ বলেন, মানুষ তার শরীরের ৮টি অঙ্গ দান করতে পারেন। এক্ষেত্রে সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি টিম করে দিতে হবে, যাদের মাধ্যমে কিডনিসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা করা হবে। ইমোশনাল ডোনারদের ভালোমতো শনাক্ত করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, কিডনি বিকল হয়ে গেলে রোগীর প্রকৃত চিকিৎসা হলো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। এর মাধ্যমে রোগীরা আগের মতো জীবনযাপন করতে পারেন, নারীরা গর্ভধারণ ও সন্তান জন্ম দিতে পারেন। এজন্য ট্রান্সপ্ল্যান্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছর যতগুলো ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন হয়, তার ৫ শতাংশও আমরা করতে পারি না। প্রতিবছর আমরা ৪৫০টি ট্রান্সপ্লান্ট করতে পারি, যার বেশির ভাগই বেসরকারিতে। তিনি বলেন, আমাদের সাশ্রয়ী লেভেলে এটি করতে হবে। বেসরকারি লেভেলে করতে চাই তাহলে আমাদের করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা বিষয়ে রেনাল অ্যাসোসিয়েশন কাজ করছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ইতোমধ্যে একটি ভ্রাম্যমাণ ক্যারাভ্যান উদ্বোধন করা হয়েছে। এটি বছরব্যাপী বিভিন্ন জায়গা ঘুরে জনসচেতনতা তৈরি করবে। এছাড়া কিডনি রোগ প্রতিরোধে স্ক্রিনিংয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং করতে বিনামূল্যে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা চালু করা হবে। কিডনি বিকল রোগীদের ডিজিজেজ ট্রান্সপ্লান্টেশন বেশি জরুরি। ডিজিজেজ ট্রান্সপ্লান্টেশন মোটিভেশনের জন্য গ্রুপ কাউন্সিলর নিয়োগ দিয়েছি। সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ইমাম-পুরোহিতদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেছি।
অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ বলেন, কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দেশে মাত্র ১০ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস খরচ বহন করতে পারেন। পাঁচটা রোগে কিডনি ড্যামেজ করে। প্রথমত, ডায়াবেটিস, দ্বিতীয়ত, উচ্চরক্তচাপ। উচ্চরক্তচাপ আক্রান্তদের ৬০ ভাগই জানে না তারা এ রোগে ভুগছেন। তৃতীয়ত, নেফ্রাইটিস, দেশে এটি কমে গেছে। চতুর্থত, প্রস্রাবসংক্রান্ত সমস্যা। সবশেষ জন্মগতভাবে কিডনি সমস্যা। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু পরীক্ষা করে কিডনি সমস্যা নির্ণয় করা যায়।
ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হাসান চৌধুরী বলেন, বিশ্বে মোট জনসংখ্যার ১০-১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে। ২০১০ সালে রোগটি ছিল বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ১৮তম কারণ, যা বর্তমানে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। ২০৪০ সালে এটা মৃত্যুর পঞ্চম কারণ হবে। দেশে বর্তমানে কিডনি রোগীর সংখ্যা ৩ কোটি ৮০ লাখ। বছরে ৪০-৫০ হাজার মানুষের কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে বছরে প্রায় ৩০-৪০ হাজার রোগীর ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারছি।
ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ সহজ। ফলে সচেতনতার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন থেকে পরবর্তী ফলোআপ পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ টিমের অভাব রয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত নয়। কোনো রোগী আইসিইউতে ব্রেন ডেথ হলে সেটি যথাসময়ে ডিক্লারেশন না হওয়া। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দক্ষ ব্যবস্থাপনা টিম তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতে রেফারেল সিস্টেম উন্নতি করতে হবে।
এনাম আবেদীন বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা সারাক্ষণ খবরের পেছনে ছুটি। নিজের শরীরের খেয়াল রাখার সময় কম পাই। যখন সমস্যায় পড়ি তখন চিকিৎসকদের কাছে যাই। আজকের গোলটেবিল বৈঠকে কিডনি রোগ নিয়ে যে সচেতনতামূলক আলোচনা হচ্ছে দৈনিক যুগান্তরের মাধ্যমে তা সব শ্রেণির পাঠকের কাছে বার্তা যাবে। মানুষ সচেতন হবে।’
অধ্যাপক ডা. আবু সালেহ বলেন, কিডনি রোগসহ এ ধরনের বড় বড় ডিজিস প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই। স্কুল, পরিবারসহ শিশুকাল থেকে সচেতনতার শিক্ষা চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে শিশুদের পাঠ্যবইয়ে কিডনিসহ জটিল রোগের কথা তুলে ধরে কীভাবে সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া তার উপায় তুলে ধরা উচিত।
অধ্যাপক ডা. রাশেদ আনোয়ার বলেন, নতুন আইনে ইমোশনাল ডোনার নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। এটার পরিধি কতটুকু সেটি স্পষ্ট করতে হবে। তাহলে ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন আরও বাড়ানো যাবে। আইনের জটিলতা নিরসন করতে হবে। অঙ্গ ডোনেশনের ক্ষেত্রে জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের কখন ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা হবে, কখন ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন শুরু হবে, সেটি নিয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ টিম নেই। এক্ষেত্রে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানোসহ বিশেষজ্ঞ টিম করতে হবে।