দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নজিরবিহীন সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে ৩৬টি ব্যাংক। দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ এসব ব্যাংক গ্রুপটির ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করছে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরুর আগে সিটি গ্রুপের আর্থিক ও ব্যবসায়িক অবস্থা যাচাইয়ে স্বতন্ত্র অডিটর নিয়োগ এবং শীর্ষ ব্যাংকারদের সমন্বয়ে রিভিউ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বৈঠকে এক ডজনের বেশি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ বিষয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে উপস্থিত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, বৈঠকে সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা (প্রেজেন্টেশন) দেওয়া হয়। তবে গ্রুপটির ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তা সত্ত্বেও গ্রুপটিকে সচল রাখতে ব্যাংকগুলো ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।
ওই ব্যাংকার বলেন, সিটি গ্রুপের বর্তমান আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের জন্য স্বতন্ত্র অডিটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংকগুলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের নিয়ে রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাঁরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবেন।
তিনি জানান, ব্যবসা সচল রাখতে সিটি গ্রুপ তাদের কিছু নন-কোর (মূল ব্যবসার বাইরে থাকা) সম্পদ বা ব্যবসা বিক্রির পরিকল্পনার কথাও বৈঠকে জানিয়েছে। রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো সমন্বিত প্রস্তাব তৈরি করবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা চাওয়া হবে।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের অভিমত তুলে ধরে তিনি বলেন, সিটি গ্রুপ প্রকৃত অর্থেই একটি সংকটে পড়া শিল্পগোষ্ঠী। ব্যবসায়িক চাপের কারণে তারা সমস্যায় পড়েছে। এ কারণেই ব্যাংকগুলো গ্রুপটিকে পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
এর আগে একই বৈঠকে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সিটি গ্রুপের অর্থায়নের প্রয়োজন, পৃথক ব্যাংকের সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্রিজ ফাইন্যান্সিংয়ের বিষয়গুলো পর্যালোচনার জন্য জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিশেষ নীতিগত সহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিটি গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে হাজার হাজার কর্মসংস্থান, দেশের ভোগ্যপণ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঋণগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করে পুনর্গঠনের আওতায় আনা হবে এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে গ্রুপটির নগদ অর্থপ্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট গঠন করা হবে, যা থাকবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর যৌথ তত্ত্বাবধানে।
ব্যাংকাররা জানান, বৈশ্বিকভাবে ব্যবহৃত ‘ওয়াটারফল মেকানিজম’ অনুসরণ করে গ্রুপটির আর্থিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ ব্যবস্থায় ব্যবসা থেকে আসা সব আয় প্রথমে এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এরপর নির্ধারিত অংশ চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবসায় পুনর্বিনিয়োগ করা হবে এবং অবশিষ্ট অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধি সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হতে পারেন। এর মাধ্যমে অর্থের ব্যবহার, বিক্রয় কার্যক্রম এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের উদ্যোগে বিষয়টি এগিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমানও শিল্পগোষ্ঠীটির কার্যক্রম সচল রাখতে সমন্বিত সমাধানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির স্বার্থে উদ্যোগ : পাঁচ দশকের বেশি সময় ব্যবসা পরিচালনা করে আসা সিটি গ্রুপ বর্তমানে বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। শিল্পগোষ্ঠীটির উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যাংকারদের মতে এ ধরনের বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বিত পুনর্গঠন উদ্যোগ ভবিষ্যতে করপোরেট সংকট মোকাবিলায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
সংকটের পেছনে বহুমুখী কারণ : সিটি গ্রুপের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকটের কারণে গ্রুপটি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে গ্রুপটি ২ হাজার ৫০০ কোটির বেশি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা লোকসান বহন করেছে। একই সময়ে অনেক ব্যাংকের ঋণসহায়তা সংকুচিত হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, একসময় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকিংসুবিধা থাকলেও ডলারের বিনিময়হার বৃদ্ধির কারণে সেই অর্থের প্রকৃত আমদানিসক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে গ্রুপটির প্রায় ৯০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
নতুন সম্ভাবনার দ্বার : সিটি গ্রুপের ছয়টি বৃহৎ শিল্প প্রকল্প বর্তমানে মুন্সিগঞ্জে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংযোগ পেলে এসব প্রকল্প চালু হওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রুপটি ইতোমধ্যে অপ্রধান (নন-কোর) সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সহায়তায় ব্যবসার মূল খাতগুলো আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে সমন্বিত তদারকি, উন্নত করপোরেট গভর্ন্যান্স, কার্যকর নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সিটি গ্রুপ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। তাঁদের মতে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এ ধরনের পুনরুদ্ধার উদ্যোগ সফল হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সব ব্যাংকই বৈঠকে অংশ নিয়েছে। এটি খুবই ফলপ্রসূ বৈঠক ছিল। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এরপর ১২ থেকে ১৩ জন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, ডিএমডি ও এএমডিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কমিটি সিটি গ্রুপের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা, কী পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন, পৃথক ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্রিজ ফাইন্যান্সিংয়ের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবে। একই সঙ্গে এ ধরনের অর্থায়নের আগে প্রয়োজনীয় ডিউ ডিলিজেন্সও সম্পন্ন করবে।’
মাসরুর আরেফিন জানান, ‘কমিটি আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে তাদের প্রতিবেদন দেবে। এরপর আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) এই চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এবিবি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করবে এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ৩০ জুন পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ হিসাবকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে। অর্থাৎ আমরা এ বিষয়ে এককালীন একটি নিয়ন্ত্রক ছাড় (ওয়ান-অফ রেগুলেটরি ডিসপেনসেশন) চাইব।’