বাংলাদেশে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফল উৎপাদিত হয়। দেশের উর্বর মাটি, উপযোগী জলবায়ু এবং কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ফল উৎপাদনে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় দেশে পরিণত করেছে। আম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, আনারস, পেঁপে, লিচু, তরমুজ, নারকেল, বরই, কুল, বেল, জাম, জামরুল, করমচা, আতা, চালতা, আমড়া, জলপাইসহ প্রায় ৭০টিরও বেশি প্রজাতির ফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা, স্ট্রবেরি, অ্যাভোকাডোসহ নতুন ফলের চাষও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এত উৎপাদনের পরও দেশের ফল খাত একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি। তাহলো, ফলের অপচয়।
বিভিন্ন গবেষণা ও কৃষি খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫০-৫৬ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয়। কিন্তু উৎপাদিত ফলের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১০-১৫ লাখ টন ফল ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়। এটি শুধু খাদ্যের অপচয় নয়; এটি কৃষকের শ্রম, জমি, পানি, সার, পরিবহন ব্যয় এবং জাতীয় সম্পদের অপচয়। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এই অপচয়ের আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকারও বেশি।
কিন্তু এই সমস্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি বিশাল সম্ভাবনা। পৃথিবীর উন্নত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিগুলো ফলের অপচয়কে বর্জ্য হিসেবে দেখে না; বরং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। যে ফল বাজারে বিক্রি করা যায় না, যে ফলের আকার ছোট, যে ফল পরিবহনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে যার দাম পড়ে যায়,সেসব ফলই প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মূল কাঁচামাল। বাংলাদেশেও এই ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ফলভিত্তিক শিল্পখাত গড়ে তোলা সম্ভব।
ধরা যাক, বছরে অপচয় হওয়া ১০-১৫ লাখ টন ফলের মাত্র ৭০ শতাংশ শিল্পে ব্যবহার করা গেল। তাহলেও ৭-১০ লাখ টন ফল শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে পাওয়া যাবে। একটি মাঝারি আকারের ফল প্রক্রিয়াজাত কারখানা বছরে গড়ে ৫ হাজার টন ফল ব্যবহার করে। সেই হিসাবে শুধু অপচয় হওয়া ফল দিয়েই দেশে ১৫০-২০০টি মাঝারি শিল্প এবং কয়েকশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এতে কৃষকের ক্ষতি কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আমদানি নির্ভর অনেক খাদ্যপণ্য দেশেই উৎপাদন করা যাবে।
বাংলাদেশের ফলভিত্তিক শিল্পকে কয়েকটি বড় খাতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফলের পাল্প ও জুস শিল্প। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ আম, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, মাল্টা, কমলা ও ড্রাগন ফল থেকে উচ্চমানের পাল্প ও জুস তৈরি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের পাল্প অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন পণ্য। বিশেষ করে আমের পাল্প মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ মৌসুম শেষে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সেখানে আধুনিক পাল্প কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবে এবং সারা বছর আমভিত্তিক পণ্য উৎপাদন করা যাবে।
আমভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আমের জুস, আমের পাল্প, আমসত্ত্ব, আমের বার, আমের জ্যাম, আমের আচার, ফ্রোজেন আম কিউব, আমের পাউডার এবং শিশু খাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে আম ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে ভারতে হাজার হাজার কোটি টাকার আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প রয়েছে। বাংলাদেশের আম উৎপাদনও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ আম শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব।
পেয়ারা বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরিশাল এবং নরসিংদী অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারার একটি বড় অংশ বাজারজাত হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। অথচ পেয়ারা থেকে জুস, নেকটার, জ্যাম, জেলি, ফল লেদার, শুকনা পেয়ারা, ক্যান্ডি, ভিনেগার এবং পেকটিন উৎপাদন করা যায়। পেকটিন হচ্ছে খাদ্যশিল্পের একটি মূল্যবান উপাদান, যা জেলি ও জ্যাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে পেকটিন প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর।কলা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ফলগুলোর একটি। নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রংপুর এবং বগুড়া অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কলা উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে প্রায়ই কলার দাম কমে যায় এবং অনেক কলা নষ্ট হয়ে যায়। এই কলা ব্যবহার করে কলা চিপস, কলা স্লাইস, কলার গুঁড়া, কলার পিউরি, কলার পেস্ট, শিশু খাদ্য, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস এবং বেকারি শিল্পের কাঁচামাল তৈরি করা যায়। নরসিংদীকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ ‘কলা শিল্প ক্লাস্টার’ গড়ে তোলা হলে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
আনারস বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সম্ভাবনা। গাজীপুর, টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আনারসের একটি বড় অংশ মৌসুমে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আনারস থেকে জুস, ক্যানজাত আনারস, শুকনা আনারস, আনারস কনসেনট্রেট এবং বিভিন্ন পানীয় প্রস্তুত করা যায়। থাইল্যান্ডের মতো দেশ আনারস প্রক্রিয়াজাত শিল্প থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু কাঁঠালের শিল্পায়ন এখনও খুব সীমিত। কাঁঠাল থেকে চিপস, কাঁঠালের বীজের গুঁড়া, কাঁঠালের ময়দা, কাঁঠাল লেদার, কাঁঠালের জ্যাম এবং রেডি-টু-কুক পণ্য তৈরি করা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ ও আমেরিকায় কাঁচা কাঁঠাল উদ্ভিজ্জ মাংসের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ফলভিত্তিক শিল্পের আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত হলো ডিহাইড্রেটেড বা শুকনা ফল শিল্প। বর্তমানে বিশ্বের স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে শুকনা ফলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শুকনা আম, শুকনা কলা, শুকনা আনারস, শুকনা কাঁঠাল, শুকনা ড্রাগন ফল, শুকনা পেয়ারা এবং শুকনা লিচু আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। বাংলাদেশে এখনও এই শিল্প প্রায় অনুপস্থিত।
দেশীয় ফলগুলো নিয়েও একটি বড় শিল্পখাত গড়ে তোলা সম্ভব। বরই, কুল, বেল, জলপাই, আমড়া, করমচা, চালতা, জাম, জামরুল, কদবেল ও তাল দিয়ে আচার, মোরব্বা, জুস, স্বাস্থ্যকর পানীয়, হারবাল পণ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যাল পণ্য তৈরি করা যায়। বর্তমানে যেসব ফলকে “অপ্রধান ফল” বলা হয়, সেগুলোই ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত পণ্যের উৎস হতে পারে।
পেঁপে শিল্পের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কাঁচা পেঁপে থেকে প্যাপেইন (Papain) নামক একটি মূল্যবান এনজাইম উৎপাদন করা যায়, যা খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী এবং বায়োটেক শিল্পে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্যাপেইন শিল্প প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ পেঁপে উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে ছোট ও মাঝারি প্যাপেইন কারখানা স্থাপন করা গেলে এটি একটি উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
ফলভিত্তিক শিল্পায়নের জন্য জেলা ভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলাও জরুরি। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম শিল্পাঞ্চল, ঝালকাঠি-পিরোজপুরে পেয়ারা শিল্পাঞ্চল, নরসিংদীতে কলা শিল্পাঞ্চল, গাজীপুর-মধুপুরে আনারস শিল্পাঞ্চল, দিনাজপুর ও রংপুরে লিচু শিল্পাঞ্চল এবং যশোর-খুলনায় কুল ও বেলভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং কৃষক সরাসরি উপকৃত হবে।
তবে শিল্প গড়ে তুলতে হলে কেবল কারখানা স্থাপন করলেই হবে না। প্রয়োজন আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, সংগ্রহ কেন্দ্র, মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি, প্যাকহাউস, কোল্ড চেইন পরিবহন এবং দক্ষ জনশক্তি। সরকার, বেসরকারি খাত এবং উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সরকার চাইলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে ‘অগ্রাধিকার শিল্প’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। নতুন শিল্প স্থাপনে কর রেয়াত, স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য চুক্তিভিত্তিক চাষ (Contract Farming) চালু করা হলে শিল্প ও কৃষির মধ্যে স্থায়ী যোগসূত্র তৈরি হবে।
আজ যে ১০-১৫ লাখ টন ফল নষ্ট হচ্ছে, সেটি যদি সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর করা যায়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার একটি নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী।
[email protected]