বিতর্কিত এক-এগারোর অন্যতম দুই কুশীলব প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) শেখ মামুন খালেদ এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শেখ মামুন খালেদ ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীরর বিরুদ্ধে মানবপাচারকারী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদেরকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তারা তেমন তথ্য দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা।

বহুল আলোচিত এক-এগারোর সময় নিপীড়ন-নির্যাতন এবং পরবর্তী সময়ে গুম, খুন ও আয়না ঘর নির্মাণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকায় ওই সব ঘটনার তদন্ত নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামুন খালেদের বিরুদ্ধে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার বানানো, দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তাদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে চাকরিচ্যুত করা এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের শতকোটি টাকা লুটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদের নায়ক এবং গোপন বন্দিশিবির ‘আয়নাঘর’ সৃষ্টির অন্যতম হোতা। গতকাল ডিবির একাধিক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, দুই সাবেক লে. জেনারেল ডিজিএফআইয়ের দায়িত্বকালীন সময় ক্ষমতার দম্ভে হেন এমন কোনো কাজ নেই তারা করেনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন মামুন খালেদ (২০১১ থেকে ২০১৩) সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। শেখ হাসিনার নির্দেশের বাইরেও মামুন খালেদ ডিজিএফআইকে একটি কুখ্যাত বাহিনীতে পরিণত করে। তার ক্ষমতার দম্ভে শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গই নয়, অনেক সেনাকর্মকর্তাকে জঙ্গি বানিয়ে চাকরিচ্যুতির পর নিপীড়ক ও খুনি বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালার অন্যতম হোতা বলা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, ২০১২ সালে মেজর জিয়াকে গুম করার নেপথ্যে মামুন খালেদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদসহ বরেণ্য সাংবাদিক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তার বিশেষ সখ্য এবং বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় আগাম তথ্য জেনেও ব্যবস্থা না নেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ সেনা অফিসাররা মামুন খালেদকে চেনেন তাদের অর্থ আত্মসাৎকারী হিসেবে। জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। আশিয়ান সিটির মাধ্যমে ওই প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নজরুল ইসলামের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। মামুন খালেদ সর্বমোট তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন আশিয়ান সিটির সাথে। তার মধ্যে দু’টি চুক্তি হয় ২০১১ সালের ২০ মার্চ। অন্যটি একই বছরের ২৫ মে। এসব চুক্তিতে তার সহযোগিতায় ছিলেন সাবেক কয়েকজন জুনিয়র অফিসার।

এ ছাড়াও তিনি ‘সাবলাইম’ গ্রুপের অধীন সাবলাইম নেটওয়ার্ক, সাবলাইম আইটি, সাবলাইম বাংলাদেশসহ অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন লুটপাটের অর্থ দিয়ে। এ ছাড়া ‘গ্রিন রেড লিমিটেড’ নামে একটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি বাসভবনকে ব্যবসার ঠিকানা বানিয়ে ২০০ কোটি টাকার ফ্লাইওভারের কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মামুন খালেদের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তথ্য আরো ভয়াবহ। এক-এগারোর সময় ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার নামে তিনি ব্যাপক চাঁদাবাজি করেন বলে অভিযোগ। বিএনপি নেতা একরামের অফিস থেকে জোরপূর্বক ৪০ লাখ টাকার শেয়ার লিখে নেয়ার অভিযোগ আছে, যার বর্তমান মূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি। তার বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওয়ান-ইলেভেনের মাত্র এক বছরে ১৭০ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওবায়দুল করিমের ওরিয়ন ল্যাবরেটরিজ, ইউনাইটেড এয়ার ও মোসাদ্দেক আলীর বিভিন্ন কোম্পানির কোটি কোটি টাকার শেয়ার তিনি নিজের ও আত্মীয়দের নামে লিখে নিয়েছিলেন। সালমান এফ রহমানকে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানোর পুরস্কার হিসেবে তিনি ২৫ লাখ টাকার শেয়ার গ্রহণ করেছিলেন বলেও জানা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম চার বছরে শেয়ারবাজারে তার বার্ষিক টার্নওভার ছিল গড়ে ১৯০ কোটি টাকা। তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করলে ১৮ বছরের গুম, খুন এবং দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, এক-এগারোর ঘটনায় নতুন করে তদন্তের পর এই দুই আসামির নামে মামলা হলে ভুক্তভোগীরা বিচার পাবেন।

এ দিকে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ও শেখ মামুন খালেদের গ্রেফতারের প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক ও প্রকাশক আবু রুশদ এ আর এম শহীদুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার দেয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এক-এগারের পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ঘটনা ও নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

স্ট্যাটাসে আবু রুশদ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে কমিশন পাওয়ার পর একই ব্যাটালিয়নে কর্মরত অবস্থায় শেখ মামুন খালেদের সাথে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। পরে বিএনপি সরকারের সময় মামুন খালেদ ডিজিএফআইতে দায়িত্ব পান এবং ২০০৭ সালের ১/১১ এর প্রেক্ষাপটে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান।

তিনি উল্লেখ করেন, সে সময় ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন তৎপরতায় তিনি হতবাক হন। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সময় বিভিন্ন সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে তাকে একাধিকবার তলব করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

আবু রুশদ আরো বলেন, আব্দুল জলিল, শেখ সেলিম ও ওবায়দুল কাদেরকে ডিজিএফআইতে জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিও সিডি তার হাতে আসে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে তাকে ‘গায়েব’ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল এম এ মতিন বীর প্রতীকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে দাবি করেন তিনি।

স্ট্যাটাসে তিনি আরো অভিযোগ করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন ঘিরে নানা ‘ভয়াবহ পরিকল্পনা’ ও ‘অকল্পনীয় ঘটনা’ ঘটেছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী ছিল বলে তার ধারণা। তবে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তিনি প্রকাশ করেননি।

পোস্টের শেষাংশে তিনি মন্তব্য করেন, তিন গোয়েন্দা প্রধান দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেও এই দুই কর্মকর্তা দেশে ছিলেন। তার ভাষায়, ‘এরা যেতে পারেননি নাকি ওরা (ভারত) নেয়নি?’



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews