দেশে আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে এসব পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক ওঠানামা। মৌসুমে কৃষক একদিকে পণ্যের উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না অথচ কয়েক মাসের ব্যবধানে একই পণ্যের দাম দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু উৎপাদন বা সরবরাহ ঘাটতি দায়ী নয়; বরং হিমাগারকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে। এই সিন্ডিকেটের সাথে বড় আড়তদার, পাইকার, মজুদদার এবং কিছু হিমাগার মালিকের যোগসাজশ রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর এক কোটির বেশি টন আলু উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৪০০টিরও বেশি হিমাগারে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হয়। উৎপাদনের তুলনায় সংরক্ষণক্ষমতা সীমিত ও হাতে পুঁজি না থাকায় অধিকাংশ কৃষক মৌসুমেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ সুযোগ নিয়ে বড় ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি আলু ১৫ থেকে ২০ টাকায় কেনা হলেও কয়েক মাস পর সেই আলুর ঘাটতি থাকলে বাজারে তা ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠে যেত। আলুর বাম্পার ফলন অব্যাহত থাকায় এখন অবশ্য এর মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। একই সাথে কিছু কোল্ডস্টোরেজে অভিযান চালানোর পর বাজারে পণ্যটির সরবরাহ বাড়তি থাকলেও কৃষকরা আলুতে উৎপাদন খরচ উঠাতে পারেননি এমন অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে দেশীয় পেঁয়াজ ওঠার সময় দাম কম থাকলেও কয়েক মাসের মধ্যে বাজারে ইচ্ছেমতো সরবরাহ কমিয়ে দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পেঁয়াজও গুদামে আটকে রেখে বাজারে সরবরাহে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়।

একাধিক ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী আগাম অর্থায়নের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য সংগ্রহ করেন। এরপর বিভিন্ন হিমাগারে নিজেদের বা সহযোগীদের নামে সংরক্ষণ করেন। বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার দিকে খেয়াল রেখে কখনো পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তারা কারসাজি করেন। অনেক সময় একই ব্যবসায়ী একাধিক জেলার হিমাগারে পণ্য সংরক্ষণ করেন। ফলে কোনো একটি এলাকায় অভিযান চালালেও প্রকৃত মজুদের চিত্র সামনে আসে না।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব হিমাগার মালিক বাজার কারসাজির সাথে জড়িত নন। কিন্তু কিছু বড় ব্যবসায়ী একাধিক হিমাগারে জায়গা ভাড়া নিয়ে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ শুধু ভাড়া নেয়। তবে প্রকৃত মালিকানা এবং প্রকৃত মজুদের তথ্য সরকারের কাছে সবসময় স্পষ্ট থাকে না। তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে হিমাগারে কী পরিমাণ পণ্য রয়েছে, কার নামে রয়েছে এবং কখন বাজারে ছাড়া হচ্ছে এসব তথ্য রিয়েল-টাইমে জানার কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা নেই। এই তথ্যের ঘাটতির সুযোগ নিয়েই সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করলেও এসব অভিযান মূলত খুচরা বা পাইকারি বাজারকেন্দ্রিক। খুব কম ক্ষেত্রেই হিমাগারের প্রকৃত মজুদ যাচাই করা সম্ভব হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায় এবং কাগজপত্রে সবকিছু নিয়মমাফিক দেখানো হয়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অভিযোগ পেলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে ডিজিটাল স্টক মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় প্রকৃত মজুদ নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে তথ্যভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ আরো কার্যকর হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোথায় কত পণ্য মজুদ আছে, কার কাছে আছে এবং কী পরিমাণ বাজারে ছাড়া হচ্ছে এসব তথ্য সরকারের হাতে থাকতে হবে। সরবরাহ শৃঙ্খলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু না হলে সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মঈনুল খান নয়া দিগন্তকে বলেন, যদি কয়েকজন ব্যবসায়ী সমন্বিতভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য বাড়িয়ে দেন, তাহলে সেটি প্রতিযোগিতা আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের সক্ষমতা ও বাজার পর্যবেক্ষণ আরো বাড়াতে হবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল নয়া দিগন্তকে বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক ও ভোক্তা। কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, আর ভোক্তা কয়েক মাস পর একই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। মাঝখানের পুরো মুনাফা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় মজুদদারদের হাতে। কৃষকপর্যায়ে সংরক্ষণসুবিধা বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য হিমাগার মালিকদের দায়ী করা ঠিক নয়। বিদ্যুতের দাম, ব্যাংকঋণের সুদ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং শ্রমিক ব্যয় বেড়েছে। ফলে সংরক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কেউ যদি কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

তিনি বলেন, বর্তমান আইনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি কৃষিপণ্য মজুদের ক্ষেত্রে কার্যকর ঘোষণার ব্যবস্থা নেই। আবার অধিকাংশ হিমাগারে এখনো ডিজিটাল ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট চালু হয়নি। ফলে একই ব্যক্তি ভিন্ন নামে একাধিক হিমাগারে পণ্য সংরক্ষণ করলেও তা শনাক্ত করা কঠিন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রতিটি হিমাগারে ডিজিটাল স্টক ব্যবস্থাপনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিদিন কত পণ্য ঢুকছে, কত বের হচ্ছে এবং কার নামে সংরক্ষিত রয়েছে এসব তথ্য কৃষি বিপণন অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার অধিদফতর ও প্রতিযোগিতা কমিশনের সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করতে হবে। একই সাথে নির্দিষ্ট সীমার বেশি মজুদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ঘোষণা, নিয়মিত অডিট এবং বাজার কারসাজি প্রমাণিত হলে লাইসেন্স স্থগিত ও বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান কার্যকর করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের কৃষিপণ্যের বাজারে অস্থিরতার বড় কারণ উৎপাদন নয়, বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, তথ্যের অস্বচ্ছতা এবং সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তখন মৌসুমে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন, আর মৌসুম শেষে কৃত্রিম সঙ্কটের বোঝা বইতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews