খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি:এই তিনটি শব্দ একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে একজন ব্যক্তির জন্য সুষম খাদ্য নির্বাচন, খাদ্যের সহজলভ্যতা ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির উপরও পুষ্টি অনেকটাই নির্ভর করে। খাদ্যের কয়েকটি উপাদান যেমন শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করাই হল সুষম খাবার। শর্করা শরীরে শক্তি ও কার্যক্ষমতা যোগায়। চাল, গম, যব, আলু, মিষ্টি , কচু, চিনি, মধু, গুড় ইত্যাদিতে প্রচুর শর্করা পাওয়া যায়। প্রতি গ্রাম শর্করা থেকে ৪ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রোটিন হল দেহ গঠন ও ক্ষয় পূরণকারী খাদ্য। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন ডাল, বরবটি, সিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি দেহ গঠনে সহায়তা করে। প্রতি গ্রাম প্রোটিন থেকে ৪ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। চর্বি বা ফ্যাট দেহের কর্মদক্ষতা বজায় রাখে এবং ত্বক সুন্দর ও মসৃণ রাখে। সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাছ, মাংস, ডিমের কলিজা ইত্যাদি চর্বিযুক্ত খাদ্য। প্রতি গ্রাম চর্বি থেকে ৯ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। পানি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা দরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন ফলের রস, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা দরকার। আঁশ দেহের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, অন্ত্রনালীর সুস্থতা বজায় রাখে। খাদ্যের আঁশ উদ্ভিজ খাদ্য থেকে পাওয়া যায়। যেমন- লালা আটা, যব, ভুট্টা, যবের ছাতু, সীম, সীমের বিচি, ডাল ও ডালজাত খাদ্য, খোসাসহ ফল যেমন-কালোজাম, আঙুর, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি ও সব ধরনের শাক-সবজি।
খনিজ লবণ যেমন- ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন, জিংক যা দেহ গঠন, ক্ষয় পূরণ, পরিপোষণ, দেহের শরীরবৃত্তিয় কাজ করে। আয়োাডিন গলগন্ড রোগ প্রতিরোধ করে। লৌহ রক্তস্বল্পতা দূর করে হাত ও দাঁতের গঠন মজবুত করে। জিংক মানসিক ও হাড়ের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি, পাকা তেঁতুল, সামুদ্রিক মাছ, আয়োডিনযুক্ত লবণ ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে খনিজ লবণ পাওয়া যায়। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, সি-সব রকমের সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, ডিম, দুধ, কলিজা, ছোটো মাছ, লেবু চা ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য। ভিটামিন ‘এ’ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘ডি’ রিকেট রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স ত্বকের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘সি’ স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে।
অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শিশু মৃত্যুর কারণ হিসাবে পেটের অসুখ, হাম, নিউমোনিয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি না-ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রীকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধাশক্তি বিকশিত হতে পারে না। ফলে এসব ছেলে-মেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনির্ভর নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠে। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সেই সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। তা ছাড়া সঠিক রান্নার পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সবই স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে প্রভাবিত করে। মারাত্মক পুষ্টিহীন শিশুদের শুধু ডাল, আলু, সবুজ তেল দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি খাইয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব। শিশুর পুষ্টির সাথে সাথে বাড়ন্ত ও কৈশোর বয়সের ছেলে-মেয়েদের পুষ্টির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক-সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন চূড়ান্ত। তাই পুষ্টির চাহিদাও এ সময়ের পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল। এই বয়সে মেয়েদের অপুষ্টি বেশি দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে হয়। পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানি, নিয়মিত শারীরিক শ্রম, বিশ্রাম, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ের উপরও নজর দিতে হবে।
মায়ের পুষ্টি শিশুর তুষ্টি। অর্থাৎ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবতী মা-ই কেবলমাত্র স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম দিতে পারে। পুষ্টিহীন মায়ের সন্তানের জন্মকালীন ওজন কম এবং অসুস্থ, হাবাগোবা, রুগ্ন হয়ে জন্মায়। পরবর্তীতে নানা রোগে ভোগে। প্রসূতি মায়েদেরও নানা রকম জটিলতা দেখা যায়। গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী অবস্থায় মায়েদের খাবারের প্রয়োজন সাধারণ অবস্থার চেয়ে বেশি থাকে। এই সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন, জিংকসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। অনেক সময় পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা না-থাকার ফলে পুষ্টির অভাবে নিজের চাহিদার ঘাটতির সাথে সন্তানও পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি নিয়ে জন্মায়। মাকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন রঙিন শাকসবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, পানি ও পানিজাতীয় খাবার প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে হবে। তা ছাড়া এ সময় চিন্তামুক্ত ও আনন্দভাব নিয়ে থাকতে হবে। অনেক সময় কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা মায়ের অপুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাজারের টিন ও প্যাকেটজাত খাবার থেকে বাড়িতে তৈরি খাবার অনেক বেশি পুষ্টিকর। যে দেশের জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থা যত ভালো, সে দেশ তত বেশি উন্নত। সুন্দর, স্বাস্থ্যকর ও শান্তিময় জীবনযাপনে শরীর সুরক্ষার বিকল্প নেই। নিয়মিত বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং অখাদ্য-কুখাদ্য বর্জনই আমাদের সুস্থ জীবন যাপনের একমাত্র উপায়। আমরা সবাই বাঁচতে ভালবাসি। তাই বেঁচে থাকার জন্যই এত ঝক্কি-ঝামেলা। মানুষ খাওয়ার জন্য বাঁচে না, বাঁচার জন্য খায়। তা না হলে ডাক্তাররা রোগীদের যখন কিছু কিছু খাদ্যবস্তু সাময়িক খেতে বারণ করেন তখন রোগী ডাক্তারদের উপদেশ লঙ্ঘন করতেন। তাই স্বাস্থ্যের বিধিসম্মত সতর্কীকরণ, পুষ্টিকর খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে জীবনটাকে সুস্থ, রোগমুক্ত করে রাখতে কে না চায়। কিন্তু আজকাল আমরা যে সমস্ত খাবার খাচ্ছি তার অধিকাংশই ভেজাল।
নিত্যদিনের চাল, ডাল, তেল লবণসহ পানীয়দ্রব্য, ফলমূল এবং মিষ্টান্ন দ্রব্যে ভেজালের ছড়াছড়ি। যেমন কোকাকোলা, মিরান্ডা, পেপসি, ইত্যাদিতে ক্ষতিকারক রং এবং রাসায়নিক তরল পদার্থ ব্যবহার করে বাজারজাত করা হচ্ছে। মিষ্টান্ন দ্রব্য যেমন- জিলাপি, বুন্দিয়া, রসগোল্লা প্রভৃতি বানানোর জন্য ময়দা, আটা, সুজি ইত্যাদি ভালভাবে মেখে দু’-তিন দিন নিরাপদে রেখে পচানো হয় এবং তারপর নানা ধরনের পাউডার, রঙ মিশিয়ে হোটেল রেস্টুরেন্টে সাজিয়ে রাখা হয়। মরিচ গুঁড়ো, হলুদ গুড়ো ঝকঝকে রঙিন করার জন্য ইটের গুড়োও মেশানো হয় বলে প্রায়ই শোনা যায়। বছর খানেক আগে ঢাকার এক মশলা ব্যবসায়ীকে পচা চালের গুড়ো মশলায় মেশানোর দায়ে পুলিশ হাতেনাতে ধরেছিল, যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমরা দেখেছি। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল যেমন আম, কলা, পেঁপে, নাসপাতি এবং শাকসবজি যেমন টমেটো, পটল, আলু ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি তাজা রাখতে এবং কৃত্রিম উপায়ে পাকাতে ইথোফেন, ক্যালসিয়াম, কার্বাইড নামক রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে যে সমস্ত মাছ আমাদের দেশে আমদানি হচ্ছে সেগুলোতেও নাকি ফরমেলাইডিহাইড নামক এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফরমালিন প্লাস্টিক, পেপার, রং, কনস্ট্রাকশন বা মৃতদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। মানবদেহে ক্যান্সার সংক্রমণের বেলায় এই ফরমালিন যথেষ্ট সাহায্য করে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’ খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
বাংলাদেশেও ফরমালিন ব্যবহার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফরমালিন মিশানোর অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ নানা প্রকার শাস্তির ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মিষ্টি খাদ্যদ্রব্যে কোনও ভেজাল বস্তুর অস্তিত্ব ধরা পড়লে জরিমানা অথবা হাজতবাস এর বিধান চালু করেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের চকোলেট, আচার ইত্যাদির প্যাকেট লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রস্তুতের সময় মাস/বছর লেখা থাকে কিন্তু কবে মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে তা লেখা থাকে না। আবার কোনটিতে লেখা থাকে তৈরির সময় থেকে ৬ মাস পর্যন্ত ভালো থাকবে কিন্তু প্রস্তুতের সময় ও দিন তারিখ লেখা থাকে না। এসব আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা বেশিরভাগেই খেয়ে থাকে। এতে তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতি তো বটেই পেটেরেও বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। নদী বা পুকুরের পানি দিয়ে বরফ, আইসক্রিম বানানো এবং বেকারিগুলোয় মাছির উপদ্রবের মধ্য দিয়ে বিস্কুট তৈরি করার কথা আর নাইবা বললাম। আলোচ্য খাদ্যসমূহ আমাদের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির দিকে নিচ্ছে তো নিচ্ছে, আয়ুও কমাচ্ছে। সুতরাং এসব প্রতিরোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।