• বিএসএফের গুলির হুমকি, বিজিবির পাল্টা জবাব
  • ৪ দিনে আড়াই হাজার মানুষকে পুশইনের অপচেষ্টা
  • জিরো লাইনে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে শত শত মানুষ

ভারতের নয়াদিল্লিøতে বিএসএফ সদর দফতরে যখন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে টেবিল বৈঠক চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক পুশইনের মারাত্মক অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় জনসাধারণ পুশইনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সীমান্ত সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে। তবে আলোচনা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে পুশইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়সহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচন হলেও গতকাল পুশইনের চেষ্টার কারণে সীমান্ত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে আজ শূন্য হাতেই ফিরতে হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

গত কয়েক দিনে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তগুলোতে একাধিকবার বন্দুকযুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থান ও তীব্র বাগি¦তণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুশইনের বিরোধিতা করায় কোনো কোনো পয়েন্টে বিএসএফ জওয়ানরা বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলির হুমকি দিয়েছে, যার বিপরীতে বিজিবিও রণপ্রস্তুতি নিয়ে কড়া ও পাল্টা জবাব দিয়েছে।

নয়াদিল্লিতে ৮ জুন থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন আজ শেষ হচ্ছে। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাহিনীর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবার ‘অবৈধ পুশইন’ ও ‘সীমান্ত হত্যা’ বন্ধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কড়া বার্তা প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিজিবি সদর দফতরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গত এক বছরে অন্তত দুই হাজার ৪৬৩ জনকে কোনো প্রকার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে ভারত। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গারাও রয়েছে। চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও জামালপুর সীমান্তে কয়েক হাজার মানুষকে পুশইনের এমন বহু চেষ্টা বিজিবির কড়া সতর্কতায় ব্যর্থ হয়েছে।

বিএসএফের গুলির হুমকি ও বিজিবির পাল্টা হুঙ্কার : মাঠপর্যায়ের সীমান্ত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জামালপুরের বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুর এবং লালমনিরহাটের দুর্গাপুর সীমান্তে পুশইনের সময় দুই বাহিনীর মধ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। মঙ্গলবার ভোরের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বিএসএফ সার্চলাইট নিভিয়ে এবং জিরো লাইনে কাঁটাতারের গেট খুলে নারী ও শিশুদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে চায়। এ সময় বিজিবি জওয়ানরা বুক চিতিয়ে বাধা দিলে বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার ও জওয়ানরা মারমুখী আচরণ করে এবং অস্ত্র উঁচিয়ে বিজিবিকে গুলি করার হুমকি দেয়। উপস্থিত বিজিবি সদস্যরা বিন্দুমাত্র পিছু না হটে তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র তাক করে পাল্টা পজিশন নেন। বিজিবির পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, ‘বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবৈধভাবে এক পা-ও কাউকে বাড়াতে দেয়া হবে না। যদি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গুলি চালানো হয়, তবে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবিও তার অস্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে বাধ্য থাকবে।’

বিজিবির এই বীরত্বপূর্ণ ও অনমনীয় অবস্থানের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। একই সাথে স্থানীয় হাজার হাজার সীমান্তবাসী লাঠি নিয়ে বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বিএসএফের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়।

পতাকা বৈঠক ব্যর্থ, জিরো লাইনে মানবেতর জীবন : বিএসএফের এই উসকানিমূলক আচরণের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি এখন থমথমে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্ত এবং ঠাকুরগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী ও শিশুসহ বেশ কিছু মানুষ কয়েক দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে আটকে আছেন। ভারতের পক্ষ থেকে তাদের জোর করে ঠেলে দেয়া হলেও নাগরিকত্ব ও আইনি প্রমাণ ছাড়া বিজিবি তাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এই সঙ্কট নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার বিজিবি-বিএসএফের ফ্ল্যাগ মিটিং বা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের একগুঁয়েমির কারণে কোনো সুরাহা হয়নি এবং বৈঠকগুলো ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : সীমান্তের এই চলমান উত্তেজনা এবং বিএসএফের মারমুখী আচরণ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, নয়াদিল্লিতে যখন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে সীমান্ত বৈঠক চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সীমান্তে বিএসএফের এই পুশইনের হিড়িক ও গুলির হুমকি অত্যন্ত অশোভন এবং এটি মূলত বাংলাদেশের ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা।

তিনি মনে করেন, কোনো দেশের নাগরিককে যদি ফেরত পাঠাতেই হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘ডিউ প্রসেস’ বা যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলে পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে হতে হবে। রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের মুখে ঠেলে দেয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) আশরাফুজ্জামান খান বলেন, বিএসএফের গুলির হুমকির জবাবে বিজিবি যে অনমনীয় সাহস দেখিয়েছে, তা বাংলাদেশের সার্বভৌম চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমান্তে একতরফা ছাড় দেয়ার যে নীতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বিজিবি এখন দেশের সীমানা রক্ষায় যথাযথ পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছে। তবে এই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ফ্রন্টেও অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, দিল্লির বৈঠকে বিজিবি প্রধানকে অত্যন্ত জোরালোভাবে এই বার্তা দিতে হবে যে, বন্ধুত্বের নামে সার্বভৌমত্বের অবমাননা এবং নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না।

দিল্লির বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান : বিজিবি সূত্র জানায়, গতকাল সকালে সম্মেলনের কার্যবিবরণী চূড়ান্তকরণ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিজিবির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় পুশইনের বিষয়টি অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী বলে উত্থাপন করা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে লাইট বন্ধ করে পুশইন করার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে অন্তত আটজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে দিল্লির সম্মেলনে শূন্যের কোঠায় নামানোর জন্য ভারতের পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে বিএসএফের পক্ষে বরাবরের মতোই দাবি করছে যে, তারা কেবল ‘অবৈধ প্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ভারতের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়াবিহীন যেকোনো পুশইন প্রচেষ্টা বাংলাদেশ সীমান্তে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews