নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমা অতিক্রম করার পর কিভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা আবার এই সীমার নিচে নামিয়ে আনা যেতে পারে, সে বিষয়ে বুধবার একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ। এ ধরনের প্রথম মূল্যায়নটি জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের সমালোচনারও মুখে পড়েছে।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত বছর ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা অতিক্রম করার অনিবার্যতার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে এবারই প্রথম জাতিসঙ্ঘের কোনো সংস্থা এ বিষয়টি সরাসরি মোকাবেলা করে একটি পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করল।

বিজ্ঞানীরা একমত যে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠে গেলে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে। আর প্রায় ২০০টি দেশ ২০১৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে এই তুলনামূলক নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে সম্মত হয়েছিল।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ব ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করবে। ফলে এখন মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়েছে তথাকথিত ‘ওভারশুট’ বা সীমা অতিক্রমের সময়কাল যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত ও সীমিত রাখার ওপর।

প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, বহুল প্রত্যাশিত প্রতিবেদনে জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) স্পষ্টভাবে বলেছে, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করা হবে এবং ‘চ্যালেঞ্জটি এখন ওভারশুট এড়ানো থেকে তা মোকাবেলার দিকে সরে গেছে।’

প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের বিজ্ঞানী রিচার্ড বেটস বলেন, ‘এটি বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়। আমাদের এই উষ্ণতর বিশ্বের সাথে বসবাস করতে হবে... তবে উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত রাখতে এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।’

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবেদনটি কেবল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে—এ কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কিভাবে এর মোকাবেলা করা যায়, তার ওপরই গুরুত্ব দিয়েছে।

আরেক সহ-লেখক ডেব্রা রবার্টস বলেন, নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ যে খেলার নিয়ম এখন পাল্টে যাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব কোয়াজুলু-নাটালের রবার্টস বলেন, ‘আমার কাছে এটি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা... এখন আমাদের জলবায়ু শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে ওভারশুটের পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়। আমাদের কোনো পরিকল্পনাই এর জন্য প্রস্তুত নয়।’

প্রতিবেদনের কঠোর ভাষা জলবায়ু আন্দোলনকর্মীদের উদ্বিগ্ন করেছে। এক দশক আগে প্যারিস চুক্তির আরো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হিসেবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা নির্ধারণের পর থেকেই তারা এ লক্ষ্য রক্ষায় সোচ্চার।

গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের উপ-প্রোগ্রাম পরিচালক জ্যাসপার ইনভেন্টর বলেন, ‘এটি হৃদয়বিদারক একটি মুহূর্ত, কিন্তু ওভারশুট ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লড়াই ছেড়ে দেয়ার বা আত্মসমর্পণের কারণ নয়।’

জলবায়ুবিজ্ঞানী ও নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার প্রতিবেদনটির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এটি ‘লড়াইয়ের আহ্বানের বদলে উদাসীনতার আহ্বান’ হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যের সবচেয়ে সোচ্চার সমর্থকদের অন্যতম। লক্ষ্যটি নাগালের বাইরে চলে গেলেও তারা ধনী দেশগুলোকে এ লক্ষ্য পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে ১৮৫০-১৯০০ সময়কালের তুলনায় বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়েছে। আর রেকর্ড রাখার ইতিহাসে গত তিন বছর ছিল সবচেয়ে উষ্ণ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের যেকোনো মাত্রার অতিরিক্ত উষ্ণতা আরো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে এবং বরফের স্তর ধসে পড়া ও প্রবালপ্রাচীর বিলীন হওয়ার মতো ‘টিপিং পয়েন্ট’র দিকে পৃথিবীকে আরো ঠেলে দেয়।

ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, ‘আমরা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকি, তাহলে কোনো ভালো ফলাফল নেই।’

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসুন, বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে বলি—১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য এখনো বহাল আছে। তবে এখন আমাদের ভিন্নভাবে এগোতে হবে—ওপর থেকে নিচের দিকে।’

গুতেরেস বলেছেন, শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা আবার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘১.৫ ডিগ্রির জন্য লড়াই মানেই মানবতার জন্য লড়াই।’

ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ লক্ষ্য অর্জনে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানোর পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ, অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন সরিয়ে তা সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া, অপরিহার্য হবে।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্বন অপসারণের ভূমিকা অত্যন্ত সামান্য। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করার দাবিতে সোচ্চার অনেক জলবায়ু আন্দোলনকর্মী এ পদ্ধতিরও তীব্র বিরোধিতা করেন।

প্রচারাভিযান পরিচালনাকারী সংগঠন সিআইইএলের লিলি ফুর বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি কমানোর একমাত্র উপায় হলো এখনই নিঃসরণ কমানো... অনুমাননির্ভর প্রযুক্তিগত সমাধানের আশায় পদক্ষেপ নিতে দেরি করা নয়।’



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews