২৩ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ৫০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে নিজামুদ্দিন নামে একজনকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে। থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহীনের টর্চার সেলে আটকে রেখে মধ্যরাত পর্যন্ত নির্যাতন করা হয় নিজামুদ্দিনকে। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে মুমুর্ষু নিজামুদ্দিনের রক্তাক্ত পোশাক পরিবর্তন করে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। শনিবার আটজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও নির্যাতনের মামলা করেন ভুক্তভোগী। এখানে নির্যাতন ও চাঁদাসন্ত্রাসের সময়টা আমাদের কাছে খুবই গুরত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকারের নতুন বাংলাদেশে শুরুতেই এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনা আরো ঘটছে, যা আকাক্সক্ষার নতুন বাংলাদেশে ঘটার কথা ছিল না।
ভুক্তভোগী নিজামুদ্দিন জানানা, তিনি ২০২০ সাল থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় নদীর ঘাটে বিআইডব্লিউটি-এর বৃক্ষ বাগান দেখাশোনা করে আসছেন। সম্প্রতি বিএনপি ক্ষমতায় এলে শাহীনের লোকজন বাগানটি ইজারা নেওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএতে আবেদন করে। ইজারা না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হন। পরে ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঁচ-ছয়টি মোটরসাইকেলে লোকজন নিয়ে এসে হাসনাবাদ লাজফার্মার গলির চায়ের দোকান থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। পরে হাসনাবাদ কামুচান শাহ মাজার রোডে শাহীনের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসটিতে তিনটি রুম রয়েছে। এর একটি টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এমন গল্প আমাদের কাছে খুব একটা অপরিচিত নয়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে এমন ঘটনার কোনো অভাব ছিল না। এ কারণেই তো জুলাই অভ্যুত্থান এবং নির্বাচিত সরকার। প্রশ্ন হলো, নতুন সরকারের আমলেও কি অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে? প্রশ্ন জাগছে, তাহলে এত জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আমরা কি পেলাম? দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী নিজামুদ্দিন শনিবার থানায় অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলা করেছে। থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই ফরহাদকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সাময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশ যেভাবে কথা বলতে অভ্যস্ত, সেভাবেই কথা বলছেন, যেভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত সেভাবেই কাজ করছেন। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই কোনোকিছুতে পরিবর্তন এসে যাবে না। উল্লেখ্য, যাদের আসামী করে মামলা হয়েছে, তাদের সবাই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। এতে বিএনপির নেতৃবৃন্দ একটা বেকায়দায় পড়ে গেছেন। ফলে রোববার কেরানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি নিপুন রায় চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মোজাদ্দেদ আলী বাবু একটু তৎপর হলেন এবং অভিযুক্ত নেতা ফয়েজ আহমদ শাহীনকে দল থেকে বহিষ্কার করলেন।
বহিষ্কারের এমন বহু ঘটনা আমরা ফ্যাসিস আওয়ামী আমলেও লক্ষ্য করেছি। তবে এই দাওয়ায় কোনো কাজ হয়নি। এতে আপাতত মুখ রক্ষার কাজটা হয়তো হয়েছে, কিন্তু সংকটের মূলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিপক্ষও ঘটনা থেকে ফায়দা নেওয়ার, মজা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। অপহরণ ও নির্যাতনের মত মহাঅপরাধের বিষয়টিকে যেভাবে দেখার প্রয়োজন ছিল, জাতি হিসেবে সেভাবে দেখতে আমরা সমর্থ হইনি। এর মূল কারণ ছিল ব্লেমগেম তথা দোষারোপের রাজনীতি। রাজনীতির এই ভ্রষ্টাচার থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
শুধু ব্লেম দেওয়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। যে কারণে দেশে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সেই কারণ দূর করতে না পারলে বিএনপি আওয়ামী লীগ হতে কতক্ষণ? যারা নেতা, তাদেরকে রাজনীতির জন্য দলকে প্রস্তুত করতে হবে। নেতা-নেতৃত্ব, কর্মী সংগঠনকে নিয়ে কিভাবে লক্ষ্যে পৌছঁতে হবে-সেই প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এখানে অপহরণ ও চাঁদাবাজির চিন্তা রাজনীতির অঙ্গনে কেমন করে আসে? রাজনীতিতে তো থাকবে ত্যাগ-তিতীক্ষার চেতনা। মানুষ রাজিনীতিতে, সংঘটনে দিতে আসবে; নিতে নয়। এমন রাজনীতিতে প্রয়োজন হবে নৈতিক শিক্ষা, নৈতিক মেরুদন্ড। আমাদের মাননীয় নব প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা একটু ভেবে দেখবেন কী?