দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর এক নতুন প্রেক্ষাপটে যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই সংসদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অধিবেশনের শুরুর দিনগুলোতে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে যা সংসদীয় গণতন্ত্রের সুমহান ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ চলাকালীন বিরোধী দল 'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী'র সদস্যদের আচরণ এবং কিছু সাংবিধানিক ও নৈতিক অবস্থানের স্ববিরোধিতা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের কিছু ঘটনা মন থেকে মেনে নিতে পারছি না। প্রথম ঘটনা মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে আচরণ করেছে তা সংসদীয় আচরণের পরিপন্থী এবং স্ববিরোধী। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো আলাপ-আলোচনাভিত্তিক গণতন্ত্র (Deliberative Democracy)। রাজনৈতিক দার্শনিক ইয়ুর্গেন হেবারমাসের (Jürgen Habermas) তত্ত্ব অনুযায়ী বলা যায়, সংসদ হলো এমন একটি পাবলিক স্ফিয়ার (Public Sphere) যেখানে শারীরিক শক্তি বা দৃশ্যমান ভঙ্গি নয়, বরং যৌক্তিক সংলাপই (Communicative Action) হবে প্রধান চালিকাশক্তি।
কেন সংসদীয় আচরণ হয়নি তা হলো জাতীয় সংসদ কোনো রাজপথ নয় কিংবা খেলার মাঠের গ্যালারি নয়—যেখানে আপনি আপনার মতামত প্রকাশের জন্য হাতে প্লেকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন। জনগণ আপনাকে তাদের বহুমূল্যবান পবিত্র ভোটের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে আপনার মতামত প্রকাশের জন্য, প্লেকার্ড হাতে প্রতিবাদ করার জন্য নয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আপনার প্রতিবাদ থাকলে আপনি আপনার ভাষণের মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে পারতেন। কেন রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেয়া ঠিক হয়নি আপনি দেশবাসীকে জানাতে পারতেন যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে।
প্লেকার্ড দেখিয়ে এতো মৌন ও বাচ্চাসুলভ আচরণ করে কি বুঝাতে চাইলেন? আপনার কোন যুক্তি নেই তথ্য নেই যা আপনার বক্তৃতায় বলতে পারেন—তাই নয় কি? সমাজবিজ্ঞানী আর্ভিং গফম্যান (Erving Goffman) তাঁর নাট্যতত্ত্বে (Dramaturgy) দেখিয়েছেন যে, প্রতিষ্ঠানের একটি সম্মুখভাগ (Front Stage) থাকে যেখানে নির্দিষ্ট গাম্ভীর্য বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। যখন সংসদ সদস্যরা যুক্তির লড়াই ছেড়ে প্ল্যাকার্ডের মতো প্রদর্শনমূলক প্রতিবাদের (Performative Protest) আশ্রয় নেন, তখন তাঁরা প্রকারান্তরে সংসদের বৌদ্ধিক মর্যাদা কমিয়ে দেন।
এখানে একটি বড় ধরনের বৈপরীত্য বা স্ববিরোধিতা লক্ষণীয়। প্রশ্ন করতে পারেন, এটি স্ববিরোধী কেন হলো? ৫ আগস্ট ২০২৪ যখন শেখ হাসিনার সরকার অকার্যকর করা হলো তার তিনদিন পর ৮ আগস্ট জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এই রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ বাক্য পাঠ করে উপদেষ্টা হয়েছিলেন। নাহিদের ভাষায় রাষ্ট্রপতি তো ফ্যাসিস্টের দোসর। তাহলে প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর উপদেষ্টা পরিষদ কি অবৈধ? নাহিদ ইসলাম কি জবাব দিবেন? যে নির্বাচনের মাধ্যমে আপনি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হলেন সেই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনারকে শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছেন কে? এই ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি অবৈধ হলে তাঁর নির্বাচন কমিশনার বৈধ হয় কিভাবে?
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স বেবার (Max Weber) কর্তৃত্ব বা বৈধতাকে (Legitimacy) তিন ভাগে ভাগ করেছেন: ঐতিহ্যগত, কারিশম্যাটিক এবং আইনগত-যৌক্তিক (Legal-rational)। যদি রাষ্ট্রপতির পদটিই বিতর্কিত বা অবৈধ হয়, তবে সেই উৎস থেকে নির্গত প্রতিটি প্রক্রিয়া—নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচন এবং বর্তমান সংসদের শপথ—সবই নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টন (David Easton) তাঁর পলিটিক্যাল সিস্টেম (Political System) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, সিস্টেমের ভেতরে 'ইনপুট' যদি বিতর্কিত হয়, তবে 'আউটপুট' কখনো স্থিতিশীল হতে পারে না। এই বৈধতার সংকট (Legitimacy Crisis) নিয়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে একটি স্বচ্ছ ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা জাতি প্রত্যাশা করে।
দ্বিতীয় ঘটনা জাতীয় সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেওয়ার পূর্বে জাতীয় সংগীত বেজে উঠলে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য নিজেদের আসনে বসে ছিলেন। ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে সরকারি দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাত দিয়ে ইশারা করে বারবার দাঁড়ানোর জন্য বলেছেন। কিন্তু কেউ দাঁড়ায়নি। হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপির অনুরোধে শেষাবধি তাঁরা দাঁড়িয়েছেন। এই যে জাতীয় পতাকার প্রতি অসম্মান এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে অদ্যবধি কোনদিন ঘটেনি—যেটি জামায়াতে ইসলামী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।
আশাকরি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী অধিবেশনগুলো সুচারুভাবে পরিচালিত হবে। একজন নাগরিক হিসেবে এটাই প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না; আজকের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড।
নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলতেন দেশের প্রতি এবং মানুষের প্রতি সম্মান ও মঙ্গলজনক যা তাই তাঁরা করবেন। দেশের এবং জাতির অসম্মান হয় এমন কাজ তাঁর দল কখনও করবে না। তাহলে দেশের জনগণ প্রথম দিন জাতীয় সংসদে কি দেখলো? জাতীয় পতাকার প্রতি আপনাদের অসম্মান আপনাদের অতীত কার্যক্রমকে স্মরণ করে দেয়।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) দেখিয়েছেন যে, জাতীয় প্রতীক বা আচারসমূহ সমাজের সদস্যদের মধ্যে একটি যৌথ চেতনা (Collective Consciousness) তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইকেল বিলিং (Michael Billig) তাঁর তুচ্ছ বা মামুলি বা গতানুগতিক জাতীয়তাবাদ (Banal Nationalism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার মতো প্রতীকগুলো রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সংহতির জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson) এর কল্পিত সম্প্রদায় (Imagined Communities) তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি জাতি টিকে থাকে তার সাধারণ প্রতীকের প্রতি যৌথ শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা দলের সম্পত্তি নয়; এটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যেখানে সাম্য ও সংহতির ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে প্রতীকের প্রতি এই উদাসীনতা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে এক বিরাট বৈপরীত্য তৈরি করে।
জাতীয় সংসদ ভবন হলো একটি জাতির গর্বের এবং গৌরবের জায়গা। পবিত্র জায়গা তো বটেই। একটি দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হলো সংসদ। যেখানে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য তাঁদের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখানে কথা, আচরণ সবকিছু পরিশীলিত, পরিমার্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। সংসদের আচরণ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর সুলিখিত বই ‘সংসদে যা বলেছি’ গ্রন্থ থেকে হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
"সংসদকে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর করার জন্য সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি যথেষ্ট নয়। এর কতগুলি ঐতিহ্যগত শক্তিশালী দিক আছে যার অনেকটা নিরবচ্ছিন্ন সংসদীয় চর্চার ওপর নির্ভর করে। এখানে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচার-আচরণ, মন-মানসিকতা, জ্ঞান বিশ্বাস, এবং সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি পারস্পরিক সহনশীলতা এবং শ্রদ্ধাবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।"
তাহলে প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যদের যে অশালীন, মারমুখী আচরণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে প্রদর্শিত হয়েছে তা কি প্রত্যাশিত ছিল? জাতি হতাশ হয়েছে এহেন আচরণ দেখে। তাত্ত্বিকভাবে একে বলা হয় সংসদীয় সামাজিকীকরণ (Parliamentary Socialization)। ফরাসি দার্শনিক পিয়েরে বুর্দিউ (Pierre Bourdieu) এর সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital) তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, একজন সংসদ সদস্যের আচরণই তাঁর রাজনৈতিক আভিজাত্য প্রকাশ করে। উচ্চকণ্ঠের চেয়ে উচ্চতর যুক্তির জয়গান হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
জাতীয় সংসদকে অর্থবহ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইলে রাজপথের ভাষা আর শরীরের জেস্টারের (Gesture) পরিবর্তন আনতে হবে। শব্দের ব্যবহার এবং উচ্চারণ শৈলীর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের কিংবদন্তি পার্লামেন্টারিয়ানরা আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
এছাড়াও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে মাহমুদ আলী (সিলেট), আতাউর রহমান খান, মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন তুখোড় বক্তা। বাংলাদেশ আমলে তোফায়েল আহমদ, মইনউদ্দীন খান বাদল (চট্টগ্রাম) ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন কিংবদন্তি পার্লামেন্টারিয়ান।
জাতীয় সংসদের মূল কার্যাবলি পরিচালিত হয় কার্যপ্রণালি বিধির (Rules of Procedure) দ্বারা, যা সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রণীত। স্পিকারের দায়িত্ব হলো কার্যপ্রণালি বিধির আলোকে সংসদ পরিচালনা করা। মাননীয় স্পিকার যেহেতু সংসদ অধিবেশনের সভাপতি এবং তিনি সংসদ পরিচালনা করেন সেহেতু সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিজ নিজ দলের চিফ হুইপের মাধ্যমে বক্তৃতা বিবৃতি প্রস্তাব পেশ করার জন্য অধিবেশনের শুরুতে নোটিশ দিয়ে রাখলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কথা বলার সংস্কৃতি বহাল থাকবে। ইচ্ছে হলো আর আপনি দাঁড়িয়ে গেলেন এমনটি সংসদীয় আচরণ নয়। মুখে যা আসবে তা বলাটাও শোভন নয়।
সরকারের কার্যক্রম অণুবীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং গঠনমূলক সমালোচনা করার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা বিরোধী দলের কাজ। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সংসদের কাজ—সরকার পরিচালনা সংসদের কাজ নয়। এক্ষেত্রে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং বিভিন্ন কমিটির অর্থবহ কার্যক্রম সংসদকে গতিশীল রাখে। অর্থনীতিবিদ ড্যারন আসেমোগ্লু (Daron Acemoglu) ও জেমস রবিনসনের (James Robinson) মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানই (Inclusive Institutions) টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডগলাস নর্থ (Douglass North) এর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মই (Institutions) সমাজের 'Rules of Game' বা খেলার নিয়ম ঠিক করে দেয়। সরকারি দলের উচিত বিরোধী দলের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদ দেয়া যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
আশাকরি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী অধিবেশনগুলো সুচারুভাবে পরিচালিত হবে। একজন নাগরিক হিসেবে এটাই প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না; আজকের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড।
লেখক: শিক্ষক, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম