ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পৃক্ততা সতর্ক কূটনৈতিক স্বীকৃতি থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা সমন্বয়, প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং রাজনৈতিক প্রতীকীরূপে অন্তর্ভুক্ত করে একটি দৃশ্যমান ও বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বে এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। ভারত ১৯৫০ সালে ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি কয়েক দশক ধরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সংযত রেখেছিল। ভারতের ধারাবাহিক সরকারগুলো ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি নীতিগত সমর্থন এবং প্রতিরক্ষা ও কৃষি খাতে ইসরাইলের সাথে নীরব সম্পৃক্ততার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেছে, যার মাধ্যমে ভারতের জোট নিরপেক্ষ অবস্থান এবং বহুত্ববাদী অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রতিফলিত করেছে।
কিন্তু ঠাণ্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই সীমাবদ্ধতাগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসে। অর্থনৈতিক উদারীকরণ, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী অগ্রাধিকারের ক্রমবিকাশ নয়াদিল্লিকে ইসরাইলের সাথে গভীরতর কৌশলগত সম্পৃক্ততা অšে¦ষণে উৎসাহিত করে। তবে, ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির নির্বাচনী বিজয়ের পর ভারত-ইসরাইল সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে। নরেন্দ্র মোদির অধীনে, ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক কৌশলগত বিচক্ষণতা থেকে কৌশলগত ঘোষণায় রূপান্তরিত হয়। মোদির ২০১৭ সালের ইসরাইল সফর কূটনৈতিক দ্বিধা থেকে এক ঐতিহাসিক উত্তরণের প্রতীক ছিল- যা সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে তোলে।
বর্তমানে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নরেন্দ্র মোদি আবার ইসরাইল সফর করেন। দু’দেশের মধ্যে বাস্তবসম্মত সহযোগিতার বাইরে গিয়ে এই সম্পর্ক এমন জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অভিসারকে প্রতিফলিত করে যাদের অভ্যন্তরীণ বৈধতা সভ্যতার পুনরুজ্জীবন এবং ঐতিহাসিক অভিযোগের ন্যারেটিভের ওপর ভিত্তি করে আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। কৌশল এবং পরিচয় রাজনীতির এই সংযোগস্থলটি একটি প্রতীকী মাত্রা যোগ করে, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মানুষের ধারণাকে রূপদান করে।
এই প্রেক্ষাপটে, অখণ্ড ভারতের উল্লেখ্য- উপমহাদেশজুড়ে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ওপর ভিত্তি করে একটি সভ্যতার চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে ইহুদিরা বৃহত্তর ইসরাইল সম্পর্কিত আলোচনাকে বাইবেলের স্মৃতি বলে উপস্থাপন করে এভাবে তারা ‘বৃহত্তর ইসরাইলি’ ও ‘অখণ্ড ভারত’ স্লোগান বা চিন্তাধারাকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে সুবিধা আদায় ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জোরদার করার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এর কি কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে?
সর্বোচ্চ পর্যায়ে উচ্চারিত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের সভ্যতাগত অন্তর্নিহিত সুরটিও জোরদার হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় ও ইহুদি সভ্যতার মধ্যকার সাদৃশ্যের ওপর জোর দিয়েছেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু অভিন্ন সভ্যতাগত স্থিতিস্থাপকতা এবং গণতান্ত্রিক পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের বাগাড়ম্বর কূটনৈতিক উষ্ণতাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাস্তবসম্মত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাইরেও পরিচয়ভিত্তিক সখ্যতার ধারণা তৈরিতে অবদান রাখে।
ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের গভীরতাকে প্রভাবিত করে এমন আরেকটি কারণ হলো নেতানিয়াহু ও মোদি উভয়ের মুখোমুখি হওয়া অভ্যন্তরীণ এবং কূটনৈতিক চাপ। নেতানিয়াহু গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছেন, অন্যদিকে, মোদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চাপ এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক জোটবদ্ধ হওয়ার প্রত্যাশার সম্মুখীন। এই প্রেক্ষাপটে, ভারত-ইসরাইল গভীরতর সহযোগিতাকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ন্যারেটিভ শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত আশ্বাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই ব্যাখ্যামূলক কাঠামোর মধ্যে গাজা-কাশ্মির তুলনাটি উঠে আসে। ভারত ইসরাইলি নজরদারি প্রযুক্তি ও ড্রোনকে কাশ্মিরের কথিত নিরাপত্তার ছদ্মাবরণে সেখানকার স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের নির্যাতন ও দমনাভিযানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ দু’টি নিজেদেরকে শক্তিশালী করার কৌশল খুঁজছে। ইসরাইল এবং ভারত ভূমধ্যসাগরীয় ও আফ্রিকান অংশীদারদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের নিরাপত্তাকে আরো জোরদার করার প্রয়াস চালাচ্ছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে ভারতের যেকোনো কূটকৌশল ব্যর্থ হয়ে যাবে। ইরানে ইসরাইল ও আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে ইরানেরই জয় হয়েছে। ভবিষ্যতে মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে যেকোনো অন্যায় আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব।
লেখক : সহ-সহাপতি, বিএফইউজে