দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর বর্তমান প্রেক্ষাপটে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সহযোগিতায় সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। এই দেশগুলোর গণমাধ্যম পেশাজীবীদের মধ্যে সংলাপ উৎসাহিত করা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা এবং যৌথ সাংবাদিকতার প্রসার ঘটানো এখন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে খুবই প্রাসঙ্গিক। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রচুর প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই দেশগুলোর ভূগোল, সমাজ, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে অনেক মিল রয়েছে। এটি তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমর্থন করার, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তোলার এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, কারিগরি ক্ষেত্র এবং সংস্কৃতিতে বিনিময় সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও বিশ্বের অন্যান্য অংশের সংগঠনের মতো এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য সার্ক গঠিত হয়েছিল, তবে বর্তমানে এটি অকার্যকর। স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আঞ্চলিক সংগঠনের উত্থান এবং প্রসার দেখা গিয়েছিল। বিশ্ব রাজনীতি এবং বিভিন্ন কারণ এই আঞ্চলিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার পেছনে ভূমিকা পালন করেছিল। যদিও সার্কের অনেক সাফল্য আছে, তবে এর ব্যর্থতাও অনেক। এই ব্যর্থতার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো যে সার্ক সনদে দ্বিপক্ষীয় বা বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার বিধান নেই। ফলস্বরূপ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমস্যা এবং অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সার্কের নেই। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত মীমাংসা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা আঞ্চলিক শান্তি এবং অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্যবদ্ধ পরিচয় তুলে ধরতে, ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি একটি আঞ্চলিক সংগঠন শুরু করার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ ধরনের একটি সংগঠন দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতার  সেতু তৈরি করবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাতটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেন এবং একটি আঞ্চলিক সংস্থা গঠনের খসড়া তৈরি করেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরেও এই উদ্যোগ অব্যাহত ছিল। সার্ক চূড়ান্ত এবং ১৯৮৫ সালে স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে বেশ কয়েক বছর আলোচনা হয়। তা ছাড়া এর শুরু থেকেই, সার্ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য বেশ কয়েকটি শীর্ষ সম্মেলন এবং বৈঠক করেছে।

যদিও সার্ক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এটি এখন নিষ্ক্রিয়। সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, বিশাল জনসংখ্যা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সার্ক তার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকরভাবে সক্ষম হয়নি। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি চমৎকার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হতে পারত। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে সার্কের পুনরুজ্জীবন এবং সক্রিয়তা এখন সময়ের দাবি। কেবল আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিকোণ থেকেও সার্কের পুনরুত্থান গুরুত্বপূর্ণ। এমন আশা করা হচ্ছে যে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সামষ্টিক অগ্রগতি কেবল এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের মানই উন্নত করবে না, বরং এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করবে। এই প্রচেষ্টায়, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সাংবাদিকদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

সার্ক জার্নালিস্ট ফোরাম (এসজেএফ)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে। যখন রাজনৈতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তখন সাংবাদিকরা মানুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারেন। সীমান্ত পার হয়ে সাংবাদিক সম্মেলন, বিনিময় কর্মসূচি এবং যৌথ প্রকাশনার মাধ্যমে, সাংবাদিকরা একে অপরের সংস্কৃতি এবং সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। এটি তাদের সংবাদ প্রতিবেদনকে আরও মানবিক এবং বাস্তবসম্মত করে তোলে। প্রচলিত সাংবাদিকতা প্রায়শই যুদ্ধ বা সংঘাতকে অগ্রাধিকার দেয়।  তবে ‘পিস জার্নালিজম’ বা ‘শান্তি সাংবাদিকতা’ সম্প্রতি একটি নতুন ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যখন সাংবাদিকরা সংকটের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করেন এবং সংঘাতের পরিবর্তে সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করেন, তখন এটি নীতিনির্ধারকদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।  দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ বা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে এ ধরনের সাংবাদিকতা অত্যন্ত জরুরি।

♦ লেখক : ভাইস প্রেসিডেন্ট, সার্ক জার্নালিস্ট ফোরাম-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার; প্রধান সম্পাদক, মানচিত্র, ঢাকা



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews